শাঁখা সিঁদুরের ইতিহাস

লেখক – সৈকত গোলদার

মেয়েদের মনে কী কখনও প্রশ্ন এসেছে শাঁখা সিঁদুর পরার বিধান মেয়েদেরই কেন? হয়তো অনেকের মনেই এসেছে আর তখন তারা উত্তর পেয়েছেন ব্রহ্মবৈবর্ত্য পূরাণের সেই কাল্পনিক চরিত্র তুলসী দেবী ও তার স্বামী শঙ্খাসুরের কাহিনী। কিন্তু আজ আমরা জানবো এর প্রকৃত ঐতিহাসিক ঘটনা ব্যাখ্যা।


শাঁখা সিঁদুরের ইতিহাস জানতে ইন্টারনেটে জানতে পারি ‘ডেম ব্লঁশ’ নামে একটা বই পড়লে সেই ইতিহাস জানা যাবে। বইটা আমার এক শুভাকাঙ্ক্ষীর সাহায্যে জোগারও করলাম। কিন্তু লেখিকার বক্তব্য পড়ে জানলাম উনি ভারতীয় ইতিহাস নিয়ে খুব অল্প বিস্তর জ্ঞান লাভ করেছেন অথবা ওই বিষয়ের জ্ঞানের গভীরতায় না গিয়েই উনি বইটি লিখে ফেলেছেন। উনি লিখেছেন মধ্যযুগে হিন্দু নারীরা শাঁখা সিঁদুর পরতে শুরু করেন কিন্তু হড়প্পা ও মহেঞ্জদাড়োর খনন কার্যের সময় যেই মূর্তি গুলো পাওয়া গিয়েছিল সেগুলিতে সিঁদুরের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে তা ‘এ ব্রীফ ইন্ট্রোডাকশন টু দি এনসিয়েন্ট সিভিলাইজেশ’ পড়লেই জানা যায়। অন্যদিকে ওপরেতো মহাভারতের কথা আগেই বললাম সেখানে তুলসী দেবী ও শঙ্খাসুরের কাহিনী উল্লেখ আছে অর্থাৎ সে যুগেও শাঁখা সিঁদুরের প্রচলন ছিল। এবং কেন শুরু হয়েছে সে বিষয়ে যে বাখ্যা দিয়েছেন তার কোনও সত্যতা নেই । উৎপত্তি নিয়ে একাধিক মতামত থাকলেও একটা বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা একমত । সিঁদুর পরার রীতির জন্ম কোনওকালেই প্রসাধনী হিসেবে নয় । সিঁদুরের আগে আসি বিন্দির কথায় | ‘বিন্দি’ কথাটা অপেক্ষাকৃত নতুন । সম্ভবত এসেছে সংস্কৃতের ‘বিন্দু’ থেকে । দুই ভ্রূয়ের মাঝে তিলক ছিল প্রাচীন ভারতের নারী পুরুষ নির্বিশেষে সাজের অঙ্গ ।


মাটি‚যজ্ঞের ছাই‚ চন্দন বাঁটা দিয়ে তৈরি হত এই তিলক । তিলক এবং সিঁদুরের উল্লেখ পঞ্চতন্ত্র‚ কথাসরিৎসাগর এবং কালিদাসের কাব্যেও আছে । ক্রমে তিলক বা বিন্দি হয়ে যায় সাধারণভাবে মেয়েদের সাজের অংশ । এর ব্যতিক্রমও কম কিছু নেই ।


হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী প্রকৃতির তিনটি গুণ হল সত্য‚ রজঃ এবং তমঃ । সত্যের প্রতীক হল সাদা । রজঃ হল লাল । তমঃ হল কালো । তাই‚ বিবাহের প্রতীক লাল বিন্দি । বৈধব্যে সেটাই হয়ে যায় কালো । নিয়ম অনুযায়ী‚ বাড়িতে মৃত্যুর ফলে অশৌচ হলে কেউ সিঁদুর পরতে পারবেন না । সধবারা কপালে লাগাতে পারবেন হলুদ চিহ্ন । অশৌচ কেটে গেলে ফের বিবাহিতাদের মাথায় উঠবে সিঁদুর । কেউ কেউ আবার রজঃস্বলা হলেও বিরত থাকেন সিঁদুর পরা থেকে ।
কিন্তু হঠাৎ সিঁদুর পরা শুরু হল কেন ? কেউ কেউ বলেন‚ বৈদিক যুগে বিবাহের সময় স্বামী নিজের রক্ত দিয়ে তিলক কেটে দিতেন স্ত্রীর কপালে | তবে অন্য মতটাই বেশি জোরদার । তা হল‚ নারী লুঠের তত্ত্ব । তার আগে একটু দেখা যাক প্রাচীন সমাজব্যবস্থা । অবশ্য ‘সমাজ’ বলা কতটা ঠিক হল‚ জানি না । কারণ‚ মানব তখন গুহাবাসী | এবং পৃথিবীবাসী বিবর্তিত দু পেয়ে প্রাণী মানুষ‚ তখন ছিল মাতৃতান্ত্রিক ।


এই প্রসঙ্গে রাহুল সাংকৃত্যায়নের ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’ থেকে উদ্ধৃত করার লোভ সংবরণ করতে পারছি না । খ্রিস্টের জন্মের ৬ হাজার বছর আগে ভোলগা নদীকে পটভূমি রেখে রাহুল লিখছেন‚’…বর্তমানে আরও কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে মিলে ভোলগার তীরে নিশা পরিবার বাস করছিল | নিশার পরিবারের মতো অন্যান্য পরিবারগুলিও মায়েদের ছিল |এদের পরিবার পিতৃশাসিত নয়‚ মাতৃশাসিত । তার কারণও ছিল‚ তখন কে কার পিতা‚ তা বলা আদৌ সম্ভব ছিল না ।…নিশার পূর্বে তার মা অর্থাৎ বৃদ্ধা মাতামহীর যখন শাসন ছিল‚ তখন তার পরিণত বয়সে—-অনেকগুলি স্বামী ছিল । এই স্বামীদের মধ্যে কেউ বা ভাই-স্বামী‚ কেউ বা পুত্র-স্বামী…’


তখন মেয়েরা শিশুকেও বড় করত । আবার শিকার করত‚ যুদ্ধে যেত । সবথেকে বড় কথা‚ সংসারে শেষকথা বলত । সম্ভবত‚ সন্তানধারণ করতে পারত বলেই এই প্রিভিলেজ পেত । কিন্তু কালক্রমে এই প্রিভিলেজই তাকে ঘরের কোণে সীমাবদ্ধ করে দিল । নারীর স্থান হল ঘর-সংসার ।


তাও ধরা পড়েছে ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’য় । ৩ হাজার খ্রিস্টপূর্বে মধ্য এশিয়ার পামীর মালভূমিকে পটভূমি করে রাহুল লিখছেন,’…পুরুদের শিশু‚ বৃদ্ধ ও স্ত্রীলোকেরা প্রাণের ভয়ে লুকিয়ে বেড়াচ্ছিল—-কুরুরা শেষ পর্যন্ত তাদের পাকড়াও করল । বন্দী করে রাখা তখনকার পিতৃতান্ত্রিক যুগের আইনবিরুদ্ধ কাজ ছিল | তাই শিশু থেকে আরম্ভ করে সমস্ত পুরুকুলকে তারা মেরে ফেলল এবং স্ত্রীগণকে সঙ্গে নিয়ে গেল । পুরুদের সমস্ত পশু-ধনও তারা করায়ত্ত করল । এখন সেই হরিৎ নদীর উপত্যকার নীচ থেকে ওপর পর্যন্ত কুরুদের চারণভূমি । এক পুরুষ পর্যন্ত মহাপিতর একাধিক পত্নী গ্রহণ করবার বিধান দিলেন এবং এই সময় কুরুদের ভেতর সর্বপ্রথম সপত্নী দেখা গেল…’


অর্থাৎ বিবর্তনের পরে যে গুহামানবরা মাতৃতান্ত্রিক ছিল‚ প্রস্তর যুগ পার করে ব্রোঞ্জ যুগে পা রাখতে না রাখতেই হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক । এর হাত ধরেই আসে এক গোষ্ঠী থেকে অন্য গোষ্ঠীতে নারী-লুঠ । বলা হয়‚ লুঠ করে আনা নারীদের কপালে বর্শার আঘাতে ক্ষতচিহ্ন করে দেওয়া হত (লুঠের প্রমাণ-চিহ্ন হিসেবে) | হাতে থাকত বেড়ি । কোমরে শিকল । এদেরই বিবর্তিত রূপ সিঁথির সিঁদুর ‚ হাতের শাঁখা-পলা এবং অবশ্যই লোহা (বা লোহা বাঁধানো) সম্ভবত লোহা থেকে নোয়া শব্দটি এসেছে । হয়তো বা কোমরের সেই শিকলই রূপ পেয়েছে কোমর-বিছেতে । অর্থাৎ‚ এভাবেই পুরুষদের অধিকারবোধ বা বীরত্বের প্রতীক ক্রমে পরিচিত হয় নারীর সাজ হিসেবে | মাঙ্গল্যচিহ্ন বা পবিত্রতার মাপকাঠি রূপে । পতিব্রতা স্ত্রীর গর্ব হয়ে ।

তথ্যসূত্রঃ এ ব্রীফ ইন্ট্রোডাকশন টু দি এনসিয়েন্ট সিভিলাইজেশন, বাংলালাইভ ওয়েবসাইট এর সংগৃহীত তথ্য, রাহুল সাংকৃত্যায়ন ভল্গা থেকে গঙ্গা ১৯৪৩।