কান্ত কবি ভক্ত ছবি

রজনীকান্ত সেন পাবনা জেলার (অধুনা বাংলাদেশ) ভগবানবাড়ি গ্রামে ১৮৬৫ খ্রীষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম গুরুপ্রসাদ সেন ও মাতা মনমোহিনী দেবী। রজনীকান্ত সেন কান্তকবি নামেই বেশি পরিচিত। তিনি একাধারে কবি, গীতিকার ও গায়ক ছিলেন। তিনি ‘অভয়বিহার’ নামে একটি কবিতার বই ও ‘পথচিন্তামণী’ নামে একটি কীর্তনের বই লেখেন। পিতা গুরুপ্রসাদ সেন সুগায়ক ছিলেন তাই সাংগীতিক পরিবেশে খুব ছেলেবেলা থেকেই কান্ত কবি গানের ভেতর দিয়ে ভুবনখানি দেখতে পেয়েছিলেন। পিতার কাছে সংগীতের তালিম নিয়ে তিনি সংগীতে বিশেষ পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বি.এ এবং বি.এল. ১৮৯১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত সিটি কলেজ থেকে পাশ করেন। তিনি রাজশাহীতে ওকালতি প্র্যাকটিস শুরু করেন।
প্রথম রজনীকান্ত সেনের কবিত্ব প্রতিভার প্রকাশ পায় মাত্র পনেরো বছর বয়সে তাঁর অসাধারণ শ্যামা সংগীত রচনার মধ্যে দিয়ে। অক্ষয়কুমার মিত্রের বাড়িতে তিনি তাঁর রচিত গানগুলি পরিবেশন করতেন। মাসিক পত্রিকা ‘উৎসবে’ তাঁর লেখা প্রকাশিত হত। একদিকে স্বদেশপ্রেম যেমন তাঁর গানে প্রবলভাবে প্রকাশ পেয়েছে অপরদিকে ঈশ্বর প্রেমের প্রবল প্রকাশে ভক্তিগীতিগুলি হয়েছে অনবদ্য। তবে তিনি মানবপ্রেমের গানও কিছু রচনা করেছেন। বিদেশী শাসকদের বিরুদ্ধে লেখা তাঁর সেই স্বদেশগীতি ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই’ দেশের মানুষের মনে দাগ কেটেছিল এবং বিদেশী জিনিস বর্জন করে দেশী জিনিসপত্র ব্যবহার করতে দেশবাসী উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। তাঁর রচিত সেই বিখ্যাত গান, ‘তুমি নির্মল কর, মঙ্গল কর’ শুনলে প্রাণের, মনের সব দীনতা, মোহ, কালিমা সব যেন ঘুচে যায়। আধ্যাত্মিক কান্ত কবি মনের পবিত্রতা, স্বচ্ছতাকেই সারাজীবন বেশি প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন- ঈশ্বরের কাছে আত্মনিবেদনই যেন কবির শান্তি। ভক্তিমূলক গানের জন্যই কান্ত কবি শত বাঙালির প্রাণে জায়গা করে নিয়েছেন।
রজনীকান্ত সেন রাজশাহীর বোয়ানা জেলা স্কুলে(অধুনা রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল নামে পরিচিত) পড়াশোনা করেছেন। পড়াশোনায় তাঁর ছিল অসাধারণ মেধা। তিনি রাজনাথ তর্কালঙ্কারের কাছে সংস্কৃত শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ১৫৮২ সালে এন্ট্রাস পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করেন। তাঁর স্বদেশগীতি গুলিও অসাধারণ। যেমনঃ-
‘আমরা নেহাত গরীব, আমরা নেহাত ছোট-
তবু আছি সাত কোটি ভাই, জেগে ওঠো।’
আবার তাঁর ভক্তিমূলক গানে ভক্তিভাবের এতটা প্রাবল্য যে দুঃখ, শোক, কান্না, ব্যাকুলতা সবই ঈশ্বরের দেওয়া, প্রাণ, শরীর সবই তাঁর। ঈশ্বরকে তিনি প্রাণমন দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন, তাঁর সঙ্গে এক হয়ে গিয়েছিলেন।
তোমারই দেওয়া প্রাণে তোমারই দেওয়া দুখ-
তোমারই দেওয়া বুকে তোমারই অনুভব।
তোমারই দুনয়নে তোমারই শোকবারি-
তোমারই ব্যাকুলতা, তোমারই হা-হা রব।
কিন্তু এত সাদাসিধে, সৎ, সরল মানুষটির শেষ জীবনটা বড় কষ্টে কেটেছিল। ১৯০৯ সাল থেকেই রজনীকান্ত নানা রোগে ভুগছিলেন। ১০ই সেপ্টেম্বর (১৯০৯) তিনি চিকিৎসার জন্য কলকাতার আসেন ও একজন ব্রিটিশ ডক্টর তাঁর ফুসফুস পরীক্ষা করেন ও কবির ল্যারিংসে ক্যান্সার ধরা পড়ে। অনেক ডাক্তার দেখিয়েও কবি সেরে উঠতে আর পারলেন না। অতঃপর কবি কাশিধামে যাওয়ার সিধান্ত নিলেন এবং বাবা বিশ্বনাথের স্থানে বসবাস করতে লাগলেন কিন্তু কবির শরীরের অবস্থা এতটাই খারাপ হতে লাগল যে শেষে কবি কলকাতা ফিরে আসতে বাধ্য হলেন। কিন্তু আর্থিক অনটনের জন্যে কবির এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হত না যদি না মহারাজ মণীন্দ্র চন্দ্র ও শরৎ কুমার রায় তাঁকে প্রভূত অর্থ সাহায্য করতেন। ১২ই জুন, ১৯১১ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসুস্থ কান্ত কবিকে দেখতে কলকাতা মেডিকেল কলেজে এসেছিলেন কারণ ১১/২/১৯১০ তারিখ থেকে অসুস্থ কান্ত কবিকে মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়েছিল। রবি কবিকে দেখে রজনীকান্ত এত বেশি আনন্দিত হয়েছিলেন যে ঐদিনই বিশ্বকবি চলে যাওয়ার পরে ঐ অসুস্থ অবস্থাতেই কান্তকবি এই গানটি লিখেছিলেন-
‘আমায় সকল রকমে কাঙাল করেছ গর্ব করিতে দূর-
তাই যশ ও অর্থ, মান ও স্বাস্থ্য, সকলি করেছ দূর।
এগুলো সব মায়াময় রূপে ফেলেছিল মোরে অহমিকা কূপে,
তাই সব বাধা সরায়ে দয়াল করেছ দীন-আতুর।’
কান্তকবি বোলপুরে এই গানটি বিশ্বকবির কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ৩০/০৭/১৯২০ তারিখে রবিকবি কান্তকবিকে একটি পত্র দেন, তাতে রজনীকান্ত সেনের কবিত্ব প্রতিভার ভূয়সী প্রশংসা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর করেছিলেন। সেই চিঠি পেয়ে রজনীকান্ত ভীষণ উৎসাহিত হন এবং ক্যান্সারের প্রচণ্ড কষ্ট ভুলে তিনি কিছু ‘আগমনী’ ও ‘বিজয়া’র গান লিখে ফেলেন। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা কান্ত কবিকে বেশিদিন কাছে পাইনি। শেষের দিনগুলো তিনি রোগের অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করেছেন। মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে ১৩/৯/১৯১০ তারিখে কান্তকবির আমাদের ছেড়ে পরপারে পাড়ি দেন, কিন্তু তিনি তাঁর সংগীতের জন্য আজও অমর হয়ে আছেন। তাঁকে জানাই অন্তরের ভক্তি ও শ্রদ্ধা।