ইতিহাসের খোঁজে রয়াল এগ্রি হর্টিকালচার সোসাইটি – কলমে কৌশিক নন্দী

কৌশিক নন্দী বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখনী পাঠকবর্গকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করে।

ভারতবর্ষের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতাব্দীতে যে সমস্ত বৈদেশিক পন্ডিত ও কর্মী তাদের নিরলস অধ্যবসায় ও কর্মধারার মাধ্যমে চিরস্মরণীয় আছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন উইলিয়াম কেরি। ভাষা সাহিত্যের মধ্যে তিনি শুধু নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনি ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিজ্ঞানের সুদুরপ্রসারী প্রসারের ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য।তার বহুমুখী প্রতিভার মধ্যে তার উদ্ভিদবিজ্ঞানের উপর ‌‌তার অপরিসীম জ্ঞ্যান আমাদের বিস্মিত করেছে। ভারতবর্ষ কৃষিভিত্তিক সমাজ।তাই ভারত মাতৃকার ও তাহার বাইরের দেশের তরুলতা সমন্ধে অনুসন্ধিৎসা যা আমাদের আজও অবাক করে তোলে। তাই তাঁর হাত দিয়ে গড়ে উঠেছিল ‘কৃষি সমাজ’। শুধুমাত্র ‘কৃষি সমাজ’ এর মধ্যে নামটা সীমাবদ্ধ রাখা উচিত ছিল না। কৃষি উদ্যান বিষয়ক সমাজ রাখলেও অত্যুক্তি হতো না।

শ্রীরামপুরে ছিল তাহার নিজের একটি বাগান। সেখানে তিনি গাছ গাছরা ও চাষাবাদ করতেন।গাছেদের প্রতি তার স্নেহ মাতৃ স্নেহের মত ।এমনকি তার পুত্র যবদ্বীপ থেকে গাছ সরবরাহ করতেন ।তা আমরা উইলিয়াম কেরির চিঠির মাধ্যমে জানতে পারি। কিন্তু তাহার হাতে নির্মিত এই শস্য শ্যামলা বাগানটি 1814 সালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

•••এছাড়াও তিনি শুধু নিজের বাগানের পরিচর্যায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না, মানুষের মধ্যে এই উদ্ভিদ প্রীতি জাগরণ করার জন্য সচেষ্ট হন। যখন তিনি মালদহের মদনাবাতিতে নীলকুঠির সুপারিটেন্ডেন্ট ছিলেন তখনই তিনি অনুধাবন করেছিলেন এই কৃষি ভিত্তিক সমাজে কৃষির উন্নতি আবশ্যক। তাই তিনি বঙ্গদেশে কৃষি দ্রব্যাদির উন্নতির জন্য আলোচনায় লিপ্ত হলেন। তাই তার তৎকালীন সমাজে বঙ্গদেশে কৃষি দ্রব্য লাঙ্গলের উন্নতির জন্য তার তথ্যসমূহ মৌলিক চিন্তাভাবনা এসিয়াটিক সোসাইটির মুখপত্রে এশিয়াটিক রিসার্চে ছাপা হয়েছিলো।কলকাতা শিবপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনের অধ্যক্ষ ডা রক্সবর্গের মৃত্যুর পর তার রক্ষণাবৃত তিন হাজার বৃক্ষের পরিচয় নিয়ে কেরিসাহেব অতিকায় একটি একটি পুস্তক তিন খন্ডে প্রকাশিত করেন।

••কেরি সাহেব শুধু গবেষণা পত্রের মধ্যে নিজের কর্মধারার প্রয়াসকে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় নি । তিনি জনসাধারণের মধ্যে উদ্ভিদ বিদ্যার উন্নতির জন্য তিনি কুড়িটি প্রশ্ন সম্বলিত একখানি অনুষ্ঠান পত্র তৎকালীন দেশী বিদেশী নেতৃবৃন্দের নিকট পাঠান। তিনি অঞ্চল অনুযায়ী একটি সমীক্ষা করে কোন অঞ্চলে কি শস্য উৎপদিত হবে কোন্ অঞ্চলে কি সার প্রয়োগ হবে কোথায় কি কৃষিজ যন্ত্রাংশ লাগবে এইরূপ কৃষিজ জিনিসের সার্বিক উন্নয়নের জন্য তিনি বত্রিশ জন প্রধান ব্যক্তির কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে কেরি কলকাতা টাউন হলে 1820 সালে 14 th September একটি সাধারণ সভা আয়োজন করেন। বাঙালির নিয়মানুযায়ী ঐ সভায় 7 জন উপস্থিত হলেন। কিন্তু তিনি হলেন উইলিয়াম কেরি এত সহজ ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। তাহার উদ্যেগে কৃষি সমাজের পত্তন হল । নিজে হলেন অস্থায়ী সম্পাদক।আর ওই সমাজে দুজন বাঙালি সদস্য ছিলেন বৈদ্যনাথ রায় ও রামকমল সেন। কেরী সাহেবের ইচ্ছায় রামকমল অন্যতম সদস্য নিযুক্ত হলেন বড়লাট লর্ড হেস্টিংস ও বড়লাট পত্নী এই সময়ে পেট্রন হিসাবে পৃষ্ঠপোষকতা পান। কেরির অন্যতম সহকারী জমুয়া মার্শমান প্রথম থেকে সমাজের সভ্য হয়েছিলেন।

••2nd October 1820 সাল কৃষি সভার দ্বিতীয় অধিবেশন বসলো। এদিনে তেরজন সভ্য নিয়ে।সদ্যস্যের মধ্যে জন পামার জেমস কিড জসুয়া মার্শমান রাজা বৈদ্যনাথ রায়. রাধামাধব বন্দোপাধ্যায়,রাধাকান্ত দেব হরিমোহন ঠাকুর চন্দ্রকুমার ঠাকুর প্রভৃতি ছিলেন।

••কৃষি সমাজের হস্তলিপির কার্য বিবরণী থেকে দেখা যায় যে রাধাকান্ত দেব সমাজের সদস্য করা হয়। যদিও তিনি কিছুদিনের মত সমাজের সংসর্ভে ছিলেন ।তারপর ডা ওয়ালিক সমাজের স্থায়ী সম্পাদক হন।এরপরে টিটাগর 13 সেপ্টেম্বর সভা বসে। অনেকেই বলেন যে প্রথমে এটি “এগ্রিকালচার সোসাইটি” নাম ছিল পরে “হর্টিকালচার” কথাটি যুক্ত হলো। 1829 সালে 21 শে আগস্ট সভাপতির পদে অলংকৃত করেন উইলিয়াম কেরি। এইবার এই কৃষি সমাজের কার্যপ্রণালী কিভাবে শুরু হল এই দিক টা আলোচনা করা যাক। প্রথমে টিটাগরে নিজস্ব উদ্যানে বিভিন্ন রকম গাছ পালা ও ফলের বিভিন্ন গাছ নিয়ে একটি কৃষিক্ষেত্র পরিণত করেন কেরিসাহেব। তারপর কৃষি সভার দ্বিতীয় সভাতে আলোচ্য বিষয় হলো কৃষির অবস্থা সমন্ধে নিজস্ব অনুসন্ধান। গমের চাষ বীজ, সংরক্ষণ বিভিন্ন জেলার কৃষির অবস্থা ধান ,বাজরা, মটর, ইক্ষু ,চাষ হিসাবে চুনের ব্যবহার ,উন্নত লাঙ্গল, আবহাওয়া ইত্যাদি পূর্নিয়া জেলার কৃষি বিষয়ক শব্দ সমূহ নানা বিষয়ে আলোকপাত করেছে। প্রথম সাত বৎসর সমাজের উদ্যান ছিল টিটাগর এ ইহার পরে সরকার আলিপুরে বজবজ রোডের আরম্ভ বুকে একখন্ড ভূমি কৃষি সমাজকে দান করিলে এখানে উঠে আসে।এর পরে কৃষির উন্নতির জন্য বিভিন্ন পুস্তক রচনা করা হয়। বিভিন্ন পত্র পত্রিকা বিভিন্ন রচনার মাধ্যমে পরীক্ষা মূলক ভাবে ইক্ষু রেশম তামাক তুলা প্রভৃতির গাছের উন্নতির জন্য প্রচার করা হলো তার চাষের জন্য চাষিদের জমি দেওয়া হলো।কৃষি সমাজের উদ্যেগে প্রথম কৃষি দ্রব্যের উন্নতির জন্য বিনামূল্যে বীজ দেওয়া হলো। চাষিরা এইসকল বীজ থেকে জাত ফলমূল বার্ষিক প্রদর্শনীতে হাজির করতো। 1828 সালে নয় জন মালি কে বিভিন্ন রকমের ফল উৎপাদনের জন্য পুরস্কার বিতরণ করা হলো। জল সেচের যন্ত্র নির্মাণে ব্যক্তিদের সমাজ থেকে সাহায্য করা হতো। কৃষি সমাজের এই বিভিন্ন পদ্ধতিতে সুস্বাদু ফল নির্মাণের কর্মপদ্ধতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। সুষ্ঠুভাবে এই সমাজ পরিচালনার জন্য বিলেত থেকে ডিরেকটর সভা এই সমাজকে সহস্য টাকা দান করেন এবং বাৎসরিক দশ সহস্র টাকা দানে অঙ্গীকারবদ্ধ হন। ঘটনাক্রমে হঠাৎ করে কৃষি সমাজের ঘোর দুর্দিনের সম্মুখীন হল। যাবতীয় অর্থ গচ্ছিত ছিল আলেকজান্ডার কোম্পানি নামক একটি এজেন্সি হাউস এ। সুজুকি এজেন্সি হাউসগুলো এক একটি ব্যাংকের মতো কাজ করতো। 1833 সালের 12 ই ডিসেম্বর এই বিখ্যাত হউ স্টিফেল করিলে কৃষি সমাজের সমস্ত গচ্ছিত অর্থ নষ্ট হয়ে যায়। সমাজ শক্তি সংকটের সম্মুখীন হয়। আলিপুর ও আক্রার জমি ছাড়িয়ে দিতে হয়। তারপরে 1836 খ্রিস্টাব্দে শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন এর অভ্যন্তরে দুই একর জমি সমাজ প্রাপ্ত হন ।সমাজের কর্মকুশলতায় সন্তুষ্ট হয়ে কর্তৃপক্ষ ক্রমেই ভূমি পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন। এখানে প্রায় 40 বছর অবস্থানের পর বর্তমানে এক নম্বর আলিপুরের জমিতে চলে আসে। এই জমিরও একটু ইতিহাস আছে।এই অংশটি বেলভেডিয়ার লাঠ ভবনের সংলগ্ন অঞ্চলে পতিত অবস্থায় ছিল। ইউ আর আয়তন 63 বিঘা। 1872 সালে ভারত সরকার এই প্রথম একটি সমাজ কে দান করে এবং প্রতিশ্রুতি হিসেবে বলা হয় যতদিন এই সমাজে বাগান থাকবে ততদিন এই অংশ কিছু সমাজ ভোগ করিতে পারবে। এরপর বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে বিশুদ্ধ এখানে স্থানান্তরিত করা হলো। তবে 1900 সাল পর্যন্ত কৃষি সমাজের অফিস মিউজিয়াম গ্রন্থাগার হেয়ার স্ট্রিট ও স্ট্যান্ড রোডের মোড়ে অবস্থিত হলে মেটকাক হলে। এরপর আস্তে আস্তে কৃষি সমাজের কার্য পুরোদমে শুরু হল। বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি এই সমাজের সদস্যপদ গ্রহণ করলেন। সদস্যদের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার এডওয়ার্ড রায়ান দ্বারক নাথ ঠাকুর ,প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রুস্তমজী কাওয়াসাজি, রাধাকান্ত দেব রামগোপাল ঘোষ প্রভৃতির নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনজনেই আবার সভাপতি হন। বাংলাদেশের ভিতরে বীরভূম বর্ধমান হুগলি এবং বাইরে লখনৌ মিরাট মাদ্রাজ ব্যাঙ্গালোর দানাপুর এমনকি সিঙ্গাপুরেও এই শাখা স্থাপিত হলো। বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন দ্রব্যের বীজ আমদানি ব্যবস্থা করা হলো ।যেমন মরিশাস থেকে ইক্ষু বীজ আমেরিকা থেকে তুলা বীজ আনা হলো ।দক্ষিণ আফ্রিকা চীন ম্যানিলা পশ্চিম আফ্রিকা থেকে বীজ কেনার জন্য হাজার টাকা বরাদ্দ করা হলো 1838 সালে। 1831 সাল থেকে কিছু সমাজ উন্নত ধরনের তুলা উৎপাদনের জন্য বিদেশ থেকে আমদানি কার্যে যুক্ত ছিল। অন্তরীপ থেকে ফুলকপির চাষ প্রবর্তন করা হয় পাটনাতে। বিলেত থেকে উন্নত বীজ এদেশে নৈনিতালে এবং শিলংয়ে আলু জন্মানোর শুরু হয়।যুক্তরাষ্ট্র থেকে যব ক্যারোলিন নিউ কানাডা থেকে রকমারি ধানের বীজ আনা হয়েছিল। এই সকল বীজ বিভিন্ন শাখা সমাজ সবাইকে দেশের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হতো।1842 সালে মুখপত্র “monthly journal”প প্রকাশ আরম্ভ হয় । 1852 সালে ম্যালেরিয়া প্রতিষেধক উন্নয়নের জন্য সিঙ্কোনা গাছ উৎপাদনের দিক থেকে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই কৃষি সমাজ। অস্থায়ী বড়লাট চার্লস মেটকাফ কৃষি সমাজের কার্যে বিশেষ উৎসবে প্রদর্শন করেছিলেন। পরবর্তীকালে মেটকাফ হল এর নিম্ন তলা কৃষি সমাজের অধিকারে আসে। উপরিতল স্থিত হয় কলিকাতা পাবলিক লাইব্রেরী যা বর্তমানে ন্যাশনাল লাইব্রেরী।

পরবর্তী সরকার নিজস্ব কৃষি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করলে তখন এই কৃষি সমাজের প্রতি সরকারের সাহায্য কমে যায় এবং উনিশশো সালে মেটকাফ হল কে পুরোপুরি সরকারি গ্রন্থাকারে পরিণত করার ব্যবস্থা হইল তখন কৃষি সমাজকে কিঞ্চিৎ অর্থের বিনিময় আলিপুর রোডের উদ্যানে চলে আসতে হয়। 1902 সালে মেটকাফ হল সম্পর্কে সরকার একটা আইন বিধিবদ্ধ করেন তাতা এখানে উদ্ধৃত করা হল ” and whereas at general meetings of the said society (Agriculture and Horticulture society of India) duly convened and held in accordance with the by- laws ant regulation of the fourteenth day of March one thousand and the twenty seventh day of April one thousand and nine hundred the following resolution was passed namely that the conditional offers made by the president to and accepted by the Government of Bengal for for the Government of India of the right title and interest of the society in the Metacafe hall property in consideration of a permanent permanent annuity of rupees 6000/ unfettered by any conditions affecting its enjoyment and a sum of rupees 25000/ in cash be and is hereby adopted and confirmed and that the president be and is hereby authorised to carry such transfer into effect-imperial library (indentures validation act 1902). এর এর মাধ্যমে বোঝা যায় সরকার সমাজকে এককালীন 25 হাজার টাকা প্রদান করলএবং প্রতি বছর 6000 টাকা সাহায্য দিয়ে কৃষি সমাজের সঙ্গে বন্ধন মুক্ত করল ও মেটকাফ হল এর সঙ্গে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করল। আর্থিক সংকোচনের জন্য সমাজের মূল উদ্দেশ্য সাধনে কৃষি উন্নয়ন কার্য ব্যাহত হল। কৃষিকাজের প্রসারের জন্য কৃষি সমাজ যে উন্নত পদক্ষেপ নিয়েছিল তা থেকে সমগ্র দেশবাসী বঞ্চিত হল। তারপর থেকে এই সমাজের প্রধান কাজ হল উদ্যান রচনা পুষ্প বীজ সদস্যদের মধ্যে বিতরণ এবং যথাসাধ্য পুষ্প উৎপাদন। আস্তে আস্তে কৃষি সমাজ এর নাম পরিবর্তন হলো এবং 1935 সাল থেকে কৃষি সমাজের নাম হল “রয়াল এগ্রি-হর্টি কালচার সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া”।

তথ্যসূত্র:- কলকাতা কলকাতা -পূর্ণেন্দু পত্রী। কলিকাতা দর্পন – রাধারমণ মিত্র কলকাতার পথঘাট – প্রাণতোষ ঘটক

error: Content is protected !!