তেলি সম্প্রদায় ইতিকথা – কলমে কৌশিক নন্দী

কৌশিক নন্দী বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখনী পাঠকবর্গকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করে।

বাঙালি রান্নায় তেল ছাড়া জমে না। শুধু বৃহত্তর বাংলা কেন সারা ভারতবর্ষে রন্ধনশালা চলে না তেল ছাড়া। এই তেল উৎপাদনকারী এই সম্প্রদায় তিলি নামে পরিচিত । প্রাচীন ইতিহাসে আছে তিল থেকে প্রাচীন যুগের তেল নিষ্পেষিত হত। ওই তেল রান্নার কাজ ছাড়াও মাথায় চুলে ব্যবহৃত হতো। এই তিলি সম্প্রদায় যন্ত্র দিয়ে তেল বের করার কাজ করে জীবিকা অর্জন করত।

পুরানে তাদের জীবিকা নিয়ে এক প্রাচীন ইতিহাস লুকিয়ে আছে। প্রবাদ অনুসারে মাতা ভগবতী বাটা হলুদ থেকে দুটি মানুষ সৃষ্টি করে তাদেরকে আদেশ দেন-তেল নিয়ে আসতে। তাদের মধ্যে একজন শঠতার সঙ্গে অন্যের নিষ্কাশিত পাত্রের সঞ্চিত তেল নিয়ে উপস্থিত হন তার এই নিচ কর্মের জন্য মাতা ভগবতী তাকে জাতের বা বর্ণের নিম্নস্তর নির্ধারণ করে দেন।

অপরজন তৈলবীজ থেকে তেল নিষ্কাষনের সময় দুইটি কাঠের খণ্ডের চাপে তেল নিষ্কাশন করেন। নিষ্কাশিত তেল নেকরায় ডুবিয়ে তার থেকে তেল পাত্রে নিয়ে আসার জন্য দেরিতে এসেছিল কিন্তু নিকৃষ্ট ভাবে তেল সংগ্রহ করেছিল বলে তাদেরও সমাজের নিচু স্তরে থাকার জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে তেলি সম্প্রদায় দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। একজন যেহেতু তেল নিষ্কাশনের জন্য কাঠ যা গাছের উপাদান ব্যবহার করেছিল তাই এই উপ সম্প্রদায়ের নাম হল “গাছুয়াতেলি” কোথাও কোথাও কাঠুয়া উপ সম্প্রদায়ের নামেও পরিচিত। এবং অপর জন তিন নিষ্কাষনের জন্য আঙ্গুল ব্যবহার করেছিল তাই এই উপ সম্প্রদায় কে “ভুঞ্জতেলি” নামে চিহ্নিত করা হয় এটা হলো প্রথম ধারণা।

অপর একটি প্রবাদ অনুসারে-আদিতে দেবতা শিব ছাইয়ের বদলে স্নানের পর তেল মাখার মনস্থ করেন । তার কারণে তার বাহু থেকে একজন সৃষ্টি করলেন। তার নাম হলো রুপনারায়ন তেলি ওরফে মনোহর পাল ।ওই রুপনারায়ন ওরফে মনোহরকে শিব বললেন ঘানি তৈরি করতে। সেই মত রূপনারায়ন বা মনোহর ঘানি বানিয়ে দিল এবং সেখান থেকে তেল নিষ্কাশিত করে শিব এর হাতে দিলেন। এই রূপনারায়ন থেকে তেলি সম্প্রদায় জন্ম হলো। সেই অনুসারে তেলি সম্প্রদায়ের আদি পিতা হলেন মনোহর পাল বা রূপনারাযণ তেলি। প্রখ্যাত গবেষক লেখক ডঃ ওয়াইজ এর মতে যারা শুধুমাত্র তিল শস্যদানা থেকে তেল নিষ্কাশন করেন তারাই তেলি সম্প্রদায় নামে চিহ্নিত।

এক্ষেত্রে এরা কোন বলদ ঘানির ব্যবহার করতেন না অতীতে। এরা উপ সম্প্রদায় কলু থেকে উচু শ্রেণীভুক্ত বলে চিহ্নিত। বাংলার নবাবী আমলে ওয়ারেন হেস্টিংস যার সহযোগিতায় নবাবি বন্দিশালা থেকে পালাতে পেরেছিলেন তিনি ছিলেন তিলি সম্প্রদায়ভুক্ত সামান্য মুদি কান্ত মুদি। পরে তিনি পরিচিত হন কান্তা বাবু নামে।তার নাম হয় কৃষ্ণকান্ত নন্দী। তেলি সম্প্রদায় এর মধ্যে আবার দুটি থাক দৃষ্ট হয় ক)একাদশ- খ)দ্বাদশ তেলি।

একাদশ তেলি-একটি প্রবাদ আছে যে কোন এক সময় তেরি সম্প্রদায়ের আদি পিতা মনোহরপুরের দুইজন স্ত্রী ছিলেন একদা তেল ব্যবসার কারণে দূর দেশে গমন করেন সে সময় উক্ত স্ত্রীগণ গর্ভবতী ছিলেন নির্দিষ্ট সময়ের পরে উক্ত দুইজন স্ত্রী দুইজন পুত্র সন্তান জন্মায় ফিরে আসার স্বাভাবিক অতিক্রম হয়ে যায় তার দুইজন স্ত্রী স্বামী ফিরে আসার দীর্ঘ প্রতীক্ষা করতে থাকেন একাদশ একাদশ পরীক্ষার পর তার প্রথম স্ত্রীর অন্তরে বিশ্বাস ছিল যে তার স্বামী আর জীবদ্দশায় নেই তিনি গত হয়েছেন।

তাই তিনি সধবা নারী প্রতীক নাকছাবি খুলে ফেলেন। তিনি বিধবা বলে নিজেকে পরিচিত করলেন। মনে হয় দ্বিতীয় স্ত্রী তেমনটাই বিশ্বাস করতে অস্বীকার করেন ।তিনি সবার মত স্বামীর ফিরে আসবেন এই অটল বিশ্বাসের সধবার মত জীবন যাপন করতে শুরু করতে শুরু করলেন। দ্বাদশ বছরে একদিন মনে হয় বাড়ি ফেরেন। উক্ত কারণ কি সামনে রেখে পরবর্তীতে সমাজ বিভাজন সৃষ্টি হয়।প্রথম স্ত্রী সন্তানের বংশধরের একাদশ এবং দ্বিতীয় স্ত্রী সন্তানদের বংশধরকে দ্বাদশ টিলি নামে পরিচিত সম্প্রদায় সৃষ্টি হয়।উক্ত কারণে প্রথম স্ত্রী সন্তানদের বংশধরদের কন্যা সন্তানদের নাক ছাদা করার চিরকালের জন্য নিষিদ্ধ হয়। পদবি- নন্দী ,পাল, প্রধান ,দে, কুন্ডু, সাহা প্রমুখ।

error: Content is protected !!