অবতার, পূর্ণজন্ম ও অংশাবতার; এক ঐতিহাসিক বিবর্তন – কলমে সায়ন দাস মুখার্জি

সায়ন দাস মুখার্জী বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।

‘ অবতার ‘ শব্দটি নতুন। ঋগ্বেদে অবতার শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায় নি। ‘ প্রাদুর্ভাব বা পূর্ণজন্ম শব্দটি আর অবতার শব্দটির অর্থ এক নয়। আমরা এই দুটো শব্দ কে এক করে ফেলি। আমরা গুলিয়ে ফেলি রে অবতার ও পুর্ণজন্ম এক নয়। এই দুটো শব্দের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। পূর্ণজন্ম শব্দের অর্থ হল, আত্মার ভিন্নদেহে পরিগ্রহণ করা আর অবতার শব্দটির অর্থ হল, দেবতাদের সাময়িক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য পার্থিব দেহজ ধারন। হিন্দুধর্মবাদীরা অবতার ও পূর্ণজন্ম দুটোই বিশ্বাস করে। কিন্তু ইতিহাসবিদদের বিশ্বাস করলে হয় না প্রমানও দিতে হয়। এই প্রসঙ্গে আমি অন্য প্রবন্ধে আলোচনা করবো।

তবে হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, রাম, কৃষ্ণ, বলরাম, গৌতম বুদ্ধ, জৈনধর্মের বাহুবলী ও রাজা ভারতের পিতা ঋষভ এনারা সবাই বিষ্ণুর অবতার রূপে পরিচিত হয়ে আসছে। কিন্তু রাবন-কুম্ভকর্ণ, কংস, হিরন্যকশিপু-হিরণ্যাক্ষ এনাদেরকে জয়-বিজয়ের পূর্ণজন্ম রূপে অ্যাখ্যায়িত হয়েছে। বিষ্ণুর প্রতি মুখে প্রতিটি অবতার জয়-বিজয়ের প্রতিবারের পূর্ণজন্মরূপ নিহত হয়ে আসছে। পরে অবশ্য জয়-বিজয় অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বিষ্ণুর দ্বারপালক রূপে পুজিত হয়ে আসছে। সুতরাং রামচন্দ্র ও শ্রীকৃষ্ণ (দেবকীপুত্র নন্দন) অবতার কিন্তু রাবন-কংস নয়, এরা পূর্ণজন্মবাদী। আমরা অবতার শব্দটি বিষ্ণুর ক্ষেত্রেই মানিয়ে নিয়েছি। এমনকি দেবদেবীদের সন্তান-সন্ততিরাও অবতার রূপে স্বীকৃত নন। উদাহরণ স্বরূপ পবন পুত্র হনুমান কিংবা সূর্যপুত্র যম-যমুনা, শনিদেব বা সুগ্রীব এরা কেউই অবতার নন।

কালক্রমে অবতার শব্দটি ব্যাবহার হতে বর্তমানে বিশাল ব্যাপকতা লাভ করে। তবে আবার রামায়নের রাজা দশরথের চার পুত্রদ্বয়কে অংশাবতার বলে অভিহিত করা হয়েছে। ঋগ্বেদে বামন অবতারকে বিষ্ণুর অবতার রূপে অভিহিত করা হয়নি। আবার তৈত্তিরীয় সংহিতায় বা আরণ্যকে কূর্ম ও বরাহ স্বয়ং প্রজাপতি ব্রহ্মার অবতার রূপে ধরা হয়েছে। আবার গরুড় পুরাণে কূর্ম ও বরাহ অবতার বিষ্ণুর অবতার রূপে দেখানো হয়েছে। গরুড় পুরাণে বর্ণিত অনুযায়ী বিষ্ণুর দশাবতার হিসাবে মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, শ্রীরাম, বলরাম, শ্রীকৃষ্ণ ও কল্কি।

আবার ভাগবত পুরাণ অনুসারে বিষ্ণুর বাইশটি অবতারের কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন; চতুর্সন, বরাহ, নারদ, নর-নারায়ন (যমজ ভ্রাতা), কপিলমুনি, দত্তাত্রেয়, যজ্ঞরাজ, ঋষভ (রাজা ভরত ও বাহুবলীর পিতা), পৃথ্থু, মৎস, কূর্ম, চিকিৎসক ধন্বন্তরী, মোহিনী (নারী), নৃসিংহ, বামন, ঋষি পরশুরাম, ব্যাসদেব, রাম, বলরাম-কৃষ্ণ (দেবকীপুত্র), বুদ্ধ ও কল্কি। এছাড়া কিছু অন্যান্য পৌরাণিক গ্ৰন্থে আরো তিনজন অবতারের কথা জানা যায়; প্রশ্নিগর্ভ, হয়গ্রীব ও হংস (রাজহাঁস)। আবার গৌড়ীয় বৈষ্ণব রীতি অনুযায়ী চৈতন্যদেব কেও বিষ্ণুর অবতার রূপে ধরা হয়। এছাড়া শাক্ত্যাবেস অনুযায়ী সাক্ষাৎমুনি ও অবেস অবতার কেও অবতার ধরা হয়। আবার পৌরাণিক অবতারদের পাশাপাশি ঠাকুর রামকৃষ্ণ, ঠাকুর রামবাবা, সত্য সাঁই বাবা, শিরডী সাঁই এনাদেরকেও ভারতীয় কিছু আঞ্চলিক জায়গায় বিষ্ণুর অবতার রূপে ধরা হয়।

আবার বর্তমানে স্বামী বিবেকানন্দ কেও বিষ্ণুর অবতার হিসাবে ভারতীয়রা মেনে নিয়েছে। সুতরাং আমার যা মনে হয়, যেসব ব্যাক্তি কিছু ভাল কাজের জন্য কিংবা পৃথিবীর গ্লানি দূর করার জন্য বা পৃথিবী কে পাপ মুক্ত করার জন্য নতুন দিশা দেখিয়েছে তারাই ভারতীয় হিন্দু সভ্যতার কাছে অবতারের রূপ নিয়েছে। তারাই হচ্ছে স্বয়ং বিষ্ণুর অবতার। এমনকি ভবিষ্যতেও যিনি মানুষের গ্লানি দূর করবে তিনিও ভবিষ্যতে ভারতীয়র কাছে স্বয়ং বিষ্ণুর অবতারের সিংহাসনে বসবে। অবশ্য বর্তমানে কিছু ভন্ড ব্যাক্তিও রয়েছে যারা নিজেদের কেই বিষ্ণুর অবতার ভাবে। তাই হোক এই প্রসঙ্গ বাদ দিলাম।
তন্ত্রসারোক্তে বিষ্ণুর দশাবতার স্তোত্রে উল্লিখিত হয়েছে;- ” আদায় বেদাঃ সকলাঃ সমুদ্রান্নিহত্য শঙ্খং রিপুমত্যদুপ্রম।
দত্তাঃ পুরা মেন পিতা মহায় তৎমৎস্যরা পং প্রণমামি বিষ্ণুম।।”
এখানে প্রজাপতি ব্রহ্মা ‘পিতামহ’ রূপে বিষ্ণুদেবের সহিত একাত্ম।

” প্রলয়-পয়োধিজলে, ধৃতবানসি বেদম।
বিহিত-বহিত্র চরিত্রমখেদম।।
কেশব ধৃত মীন শরীর, জয়-জগদীশ হলে।। “

জয়দেব প্রণীত দশাবতার এই স্তোত্রে পিতামহ প্রজাপতি অনুপস্থিত। প্রজাপতি ব্রহ্মার বদলে তিনি এখানে ‘কেশব’ নামটি উল্লেখ করেছেন। পূর্বেই বলেছি প্রজাপতি ব্রহ্মা পৃথিবীর গ্লানি দূর করার জন্য মৎস, কূর্ম ও বরাহর রূপ ধারন করেন। এরপর এলেন নর-নারায়ন (যমজ দুই ভ্রাতা) এনারা বিষ্ণুর সহিত মিশে যান। এনারা কিন্তু অবতার নন, এনারা হচ্ছেন মিশ্র চরিত্র। আবার বৈদিকযুগের শেষাপর্বে বাসুদেব নামক একজন দেবতার উল্লেখ পাওয়া যায়। ইনি পূর্ব ভারতের যথাসম্ভব বঙ্গেরই বাসিন্দা হবে। ইনিও কিন্তু অবতার নন, ইনি মিশ্রচরিত্র অর্থাৎ অংশাবতার। যাদববংশের একটি শাখা পশ্চিম ভারতের দিকে এগিয়ে যায় আরেকটি শাখা পূর্ব ভারতের দিকে এগিয়ে আসে। এই যাদব বংশের শাখাটি পূর্বভারতের পুন্ড্র অঞ্চলে রাজত্ব স্থাপন করেন। এই বংশের রাজা পৌন্ড্র বাসুদেব ভাগবতে যাদবকুলের দেবকীপুত্র কৃষ্ণের প্রতিদ্বন্দী।

আমি এই প্রসঙ্গে প্রফেসর তমাল দাশগুপ্তের গবেষণামূলক প্রবন্ধ “কৃষ্ণের ঐতিহাসিক বিবর্তন” থেকে কিছু উক্তি তুলে ধরলাম। বিষ্ণু বা নারায়ন বা কৃষ্ণ এরা কেউই একজন ব্যাক্তি নয়। এদের চরিত্রর মিশ্র চরিত্র (আমার মতে অংশাবতার)। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাভারতে কৃষ্ণের স্তর বিন্যাস দেখিয়েছেন। হরিবংশ, ভাগবত এবং জয়দেবের প্রনীত রচনায় কৃষ্ণ চরিত্রে র ক্রমবিবর্তন দেখিয়েছে। বিষ্ণু দেবতাকে আমরা ঋগ্বেদে গৌণ ভূমিকায় পাই। ঐতরেয় ব্রাহ্মন গ্ৰন্থে জানা গেছে, যে কোনো যুদ্ধে বিষ্ণু ইন্দ্রের সহায়ক ছিলেন। বিষ্ণুকে আমরা মহাযোদ্ধা হিসেবে বর্ণিত পেয়েছি। পরবর্তী সময়ে ইন্দ্রের বদলে বিষ্ণুর চরিত্র প্রধান হয়ে ওঠে।

এবার নারায়ন দেবের প্রসঙ্গে আসা যাক। তৈত্তিরের সংহিতায় নারায়ন ও নর যমজ ভ্রাতা। এক প্রাচীন আর্যজাতির শাখা নরজাতির নামকরন এই নর-নারায়ন থেকেই হয়েছে। এই দুই যমজ ভাই এই নরজাতির রাজা হিসাবে সিংহাসনে বসেন নর ও সেনাপতির পদে নারায়ন স্থান পায়। এর থেকে বোঝা যায় নারায়ন একজন যোদ্ধা। এমনকি মহাভারতের কুরুক্ষেত্রে এক বীর সেনার নামও নারায়ন। মহাযোদ্ধা নারায়নের ও বিষ্ণুর মূর্তিতে তাদের চারহাতে দেখা যায় দুটি অস্ত্র গলা, চক্র আরেক হাতে পদ্ম ও আরেক হাতে শঙ্খ। তবে আমাদের কাল্পনিক ভাবনায় বিষ্ণু ও নারায়নকে এক করে ফেলেছি। সুতরাং নারায়ন ও বিষ্ণু দুজনেই মহাযোদ্ধা ও ভিন্ন। এরা এক নয়।

এবার আরেক মিশ্র চারিত্রিক দেবতা বা অংশাবতার, আমরা যেই দেবতাকে বিষ্ণুর অবতার রূপে দেখি, তার কথা আমি বলি। কৃষ্ণ মানে শ্রীকৃষ্ণ। ইনি মোটেও একজন নন। এনার সাথে আরোও চারটি চরিত্রর এক হয়েগেছে। শ্রী কৃষ্ণর সাথে যেই চারটি চরিত্রর একাত্ম হয়েছে, তারা হলেন পৌন্ড্র বাসুদেব, বাসুদেব কৃষ্ণ, দেবকীপুত্র কৃষ্ণ ও শ্রীকৃষ্ণ বা রাধাকৃষ্ণ বা গোপাল। দেবকীপুত্র কৃষ্ণ একজন মুনিঋষি। ছান্দগ্য উপনিষদে এনার উল্লেখ রয়েছে। ইনি আঙ্গিরসের শিষ্য ছিলেন। ইনি মহাভারতের যুদ্ধের আগের চারিত্রিক। আবার মহাভারতে কৃষ্ণকে নারায়ন ও অর্জুন কে নর বলা হয়েছে।

আবার যেই কৃষ্ণ কে আমরা মহাভারতে পাই, ইনি বৃষ্ণিবংশীয়, নাম বাসুদেব কৃষ্ণ। প্রফেসর তমাল দাশগুপ্ত গবেষনায় দেবকীপুত্র কৃষ্ণ ও বাসুদেব কৃষ্ণ আলাদা ব্যাক্তি। ঘটনা চক্রে এনাদের মায়ের নাম এক। আর তাতেই আমরা দুজন কৃষ্ণ কে গুলিয়ে ফেলি। এছাড়া বৃষ্ণিবংশীয় তে পঞ্চবীরের উপাসনা র (বাসুদেব কৃষ্ণ, ও এনার দাদা সঙ্কর্ষন, বাসুদেব কৃষ্ণ র দুই পুত্রের প্রদ্যুম্ন ও শাম্ব এবং প্রদ্যুম্নের পুত্রের অনিরুদ্ধ) কথা মথুরা অঞ্চলে খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকে প্রাপ্ত একটি অভিলেখ থেকে জানা যায়। বিষ্ণু, নারায়ন বা কৃষ্ণ আলাদা। এর যথার্থ প্রমান আমরা মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর্বে পাই।
এবার পৌন্ড্র বাসুদেব কৃষ্ণ র কথায় আসা যাক।

পূর্বেই বলেছি পৌন্ড্র বাসুদেব কৃষ্ণ যাদব বংশের পূর্ব ভারতের শাখার নেতা। এনার সাথে তাম্রলিপ্তর দমাল জাতির শাখার সাথে কোনোভাবে একটা সম্পর্ক রয়েছে। তা অবশ্য আমার ধারনা, এখনো কোনো প্রমান পাওয়া যায় নি। আবার মহাভারতে এও দেখা গেছে যে যাদবকুলের দেবকীপুত্র কৃষ্ণ র প্রতিদ্বন্দী চরিত্রে। মহাভারতে পৌন্ড্র বাসুদেব কৃষ্ণ কে খলনায়কের চরিত্রে দেখা যায়। পুরাণে বলা হয়েছে ইনি বসুদেবের ও তাহার দাসীর সন্তান। তাই হয়তো মথু্রার সিংহাসনে বসার অধিকার ছিল না। তাই হয়তো ইনি পূর্ব ভারতের দিকে এগিয়ে আসে এবং পূর্ব ভারতে এসে সাম্রাজ্য তৈরী করে। এদের অনেক পরে শ্রীকৃষ্ণ র চরিত্র আমরা পাই। এই কৃষ্ণই হচ্ছে নন্দগোপাল, ইনিই হচ্ছে রাঁধাকৃষ্ণ আর ইনিই হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণ। ইনি হচ্ছেন আভীর জাতির বাসিন্দা।

অনেক লোককাহিনী জুড়ে বাসুদেব কৃষ্ণর চরিত্রের সাথে একাত্ম হয়ে যায়। আবার এই কৃষ্ণ গোবিন্দ নামেও পরিচিত। আবার বিষ্ণুও গোবিন্দ বা দামোদর রূপে পুজিত হয়ে আসছে। তাই হয়তো বিষ্ণুর অবতার হিসাবে শ্রীকৃষ্ণ কে ধরা হয়। শ্রীকৃষ্ণর চরিত্র আমরা কোনো যোদ্ধা হিসাবে পাই না। বরং এনাকে রোমান্টিক চরিত্রের নায়ক হিসেবে পেয়ে আসি। রাধাকৃষ্ণর লীলার সুমধুর গানগুলি প্রথম থেকেই বাংলায় প্রচলিত ছিল। পরে জয়দেব এই গৌড়ীয় গানগুলো কে সংস্কৃতের রূপ দিয়েছিলেন। সুতরাং চারজন মহাযোদ্ধা, একজন ঋষি ও একজন রোমান্টিক নায়কের মিশ্র চরিত্রে এই কৃষ্ণ চরিত্রর সৃষ্টি। সুতরাং অবতার বা পূর্ণজন্ম কিংবা অংশাবতার বা মিশ্র চরিত্র এক নয়।

তথ্যসূত্র
(১) প্রবন্ধ: কৃষ্ণের ঐতিহাসিক বিবর্তন; তমাল দাশগুপ্ত
(২) ভূবনমঙ্গল; রঘুনাথ দাস
(৩) বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত; ড. অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম খন্ড

error: Content is protected !!