লকডাউনে আমার ভাবনা – কলমে: কুহেলী বিশ্বাস

কুহেলী বিশ্বাস একজন শিক্ষিকা। নৈতিক শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত বই “বাণী বিচিত্রা”। বেলডাঙ্গা, মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা তিনি।

আমাদের দেশে চলতি বছরে (২০২০)বিগত মার্চ মাসের প্রারম্ভে শুরু হয় “করোনা” নামক এক মহামারী ভাইরাসের উপদ্রব। মূলত চীন দেশ থেকে এই ভাইরাসটির উৎপত্তি।ক্রমে ক্রমে এটি

ইতালি ,ফ্রান্স , আমেরিকা,ভারতসহ নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এর কোন প্রতিষেধক নেই বলে লক্ষ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে।

বর্তমানে সারা বিশ্বব্যাপীর মানুষ এই মহামারীর কবলে আতঙ্কিত সন্ত্রস্ত। একজনের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে ঢুকছে এই ভাইরাস ।সংক্রমণ ঠেকাতে বিশ্বব্যাপী দীর্ঘ চার মাসব্যাপী চলছে এই লকডাউন। কখনো কার্ফু জারি কখনো বা নির্দিষ্ট সময়ের মাপকাঠিতে চলেছে লকডাউন।

স্কুল, কলেজ,অফিস-আদালতে বেজেছে ছুটির ঘন্টা।
কথায় আছে, “কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ”।লকডাউনের প্রথমদিকে সাধারণ মানুষের অসহায়তার সুযোগে কিছু কিছু ব্যবসায়ীরা জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি করে নিয়ে নিজেদের মুনাফা লুটেছে। তারপর এখন বিশ্বব্যাপী যখন নিজেদেরকে বাঁচাতে এই ভাইরাস রোধক মাস্ক কিনতে বাজারে যাচ্ছে, তখন এই ব্যবসিকেরা ডবল দামে মাস্কগুলো বিক্রি করছে।কারণ তারা জানে এখন মাস্ক ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। তাই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে কেউ ছাড়ছে না।

সবকিছু মিলিয়ে মানুষের জীবন বড়ই বিপন্ন।নিজেদের পরিবারের কেউ মারা গেলে তাকে দেখতে পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না। এটা যে কত বড় বেদনাদায়ক সেটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। তারপর সেই মৃতদেহগুলি কিভাবে সৎকার করা হচ্ছে সেটাও ধোঁয়াশার মধ্যে।
এই লকডাউনের মধ্যে গৃহবন্দী মানুষেরা সাংসারিক অশান্তিতে জর্জরিত।

কত মানুষ আজ কর্মহীন হয়েছে। বিশেষ করে পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা ভাবতে গেলে চোখে জল চলে আসে। অসহায় মানুষগুলো বাড়ি ফেরার সময় ট্রেন দুর্ঘটনা বা বাস দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বহু মানুষ মৃত্যুবরণ করে। আমরা শুধুই নীরব শ্রোতা ও দর্শক। বিশেষ করে যারা বেসরকারি কর্মী তাদের অনেকেই আজ বেকার। চারিদিকে শুনছি শুধুই মানুষের হাহাকার।

এই লকডাউনে আমার চোখে সবচেয়ে অসহায় লাগছে ছোট ছোট শিশুদের। কারণ ওদের মন প্রাণ দুটোই চঞ্চল ও অবুঝ। ওরা স্কুল বন্ধ থাকায় কারো সঙ্গে মিশতে না পেরে অনেকেই মানসিক দিক থেকে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে।
যদিও অনলাইনে ক্লাস করানোর ব্যবস্থা হয়েছে, কিন্তু বন্ধু বিনে ঘরে রই কেমনে?

প্রত্যেকটা জিনিসেরই একদিক খারাপ এবং অন্য দিকে ভালো থাকে।এই লকডাউনে ঘরে বসে সময় কাটাতে আমরা অনেকেই বেছে নিয়েছি আমাদের স্মার্টফোনকে।মানুষের ভেতরে সুটপ্ত থাকা প্রতিভা গুলো এখন প্রস্ফুটিত হয়েছে। কেউ লিখছে ছড়া, কবিতা, গল্প ,প্রবন্ধ। কেউ আবৃত্তি, গান,নাচ, অভিনয়, হাতের কাজ প্রভৃতি শিল্পকর্মে নিজেদেরকে মেলে ধরেছে। ফেসবুকের দৌলতে বিভিন্ন রকম সাহিত্য পত্রিকাতে সেগুলো প্রকাশ করার সৌভাগ্য লাভ করেছে।আবার বাচ্চারা যে মোবাইলে গেম খেলার জন্যে বাবা-মাকে অনেক অনুনয় বিনয় করে লাভ করতে হতো,এখন অনলাইনে ক্লাস হবার দৌলতে তারা ক্লাসের কাজের সাথে সাথে খেলা করার সুযোগটাও পাচ্ছে।

ভালো-মন্দ যাইহোক না কেন এই লকডাউনে আমরা সবাই অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। দিনের পর দিন যেভাবে আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে করোনা সংক্রমণ যেভাবে বেড়েই চলছে তা সত্যিই দুশ্চিন্তার বিষয়। মানুষ যদি নিজে থেকে সচেতন না হয় তাহলে প্রশাসন কি করবে? নিজেদের ভালো নিজেদেরকেই বুঝতে হবে। তাই এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করতে হলে আমাদেরকে আরও সচেতন হতে হবে।বিপদ আসার পর সচেতন হবার চেয়ে বিপদ যাতে না আসে সেটার ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আমরা সুস্থ থাকতে ঘরে থাকবো। প্রয়োজনে সোশ্যাল ডিসটেন্স মেনে,মাস্ক পরে বাইরে বেরোবো এবং বাইরে থেকে এসে পরিহিত জামাকাপড় কেচে, ভালো করে পা-হাত-মুখ ধুতে হবে। তবেই আমরা এই মহামারী ভাইরাস থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারব ও লকডাউন থেকে মুক্তি পাব।

error: Content is protected !!