কোন্নগরের নবজাগরণ আন্দোলনের অগ্রদূত – শিবচন্দ্র দেব- কলমে – কৌশিক নন্দী

কৌশিক নন্দী বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখনী পাঠকবর্গকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করে।

উনবিংশ শতাব্দীর প্রাক্কালে বিভিন্ন মনীষীদের সহায়তায় তৎকালীন বঙ্গসমাজ ভাঙাগড়ার হাত ধরে চেনা দেশের নকশা গুলিকে সংস্কারের মাধ্যম দিয়ে এক নতুনভাবে পরিবর্তিত হচ্ছিল ।সেই সময় কোন্নগর নামে একটি ছোট্ট অনামী গ্রাম কে সংস্কারের মাধ্যমে দিশার আলো দেখিয়েছিলেন এক সমাজ সংস্কার তিনি হলেন- শিবচন্দ্র দেব।

আজকে যে কোন্নগর এর উন্নতি যথা রেলওয় স্টেশন পোস্ট অফিস ইংরেজি স্কুল বাংলা স্কুল ডিসপেনসারি ব্রাহ্মসমাজ সবই তার চেষ্টার ফল।1811 সালের 20 জুলাই কোন্নগর গ্রামে তার জন্ম। পিতা ছিলেন ব্রজকিশোর ঘোষ ।সরকারি চাকুরে ছিলেন । পিতা সবসময়ই সময়ের জিনিস সময়ে করতেই ভালবাসতেন তার জন্য তার পকেটে সর্বদা একটা ছোট্ট ঘড়ি থাকতো। এই কারণেই তিনি গ্রামের মধ্যে যথেষ্ট সমাদর পেতেন।

পরিবার ছিল খুব সভ্রান্ত। শিবচন্দ্র ছিলেন সবচেয়ে কনিষ্ঠতম পুত্র। হিন্দু কলেজের পাঠরত অবস্থায় শিবচন্দ্র যৌবন বয়সে ডিরোজিওর অনুরক্ত হয়ে পড়েন। কলেজে পড়বার সময় তিনি হরিমোহন এর সঙ্গে হাত মিলিয়ে আরব্য উপন্যাস বাংলাতে অনুবাদ করেন। কলেজ ছাড়িয়া তিনি প্রথম জীবনে করণিকের কাজ করেন তারপরে 1838 সালে ডেপুটি কালেক্টর হয়ে বালেশ্বর এ চাকরি করতে যান সেখান থেকে তিনি মেদিনীপুরে বদলি হন।

পরবর্তীকালে চাকরির শেষ প্রান্তে তিনি 24 পরগনার আলিপুর এর ডেপুটি কালেক্টর হইয়া আসেন ।ছোট থেকেই স্বদেশিকতার ভাবধারায় তিনি উদ্দীপ্ত হন। ছাত্র থাকাকালীন ডিরোজিওর চিন্তা ভাবনাই অনুরক্ত হওয়ার জন্যই তিনি অন্তরে অন্তরে একেশ্বরবাদী হয়ে ওঠেন। 1843 সালে তিনি ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করার পর তার এই ধারণা অনেক বলশালী হয় এবং তিনি উৎসাহ সহকারে পরব্রহ্ম উপাসনা আরম্ভ করেন।

ক্রমশ তার ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতি অনুরাগ বৃদ্ধি পেতে শুরু করে ও সেই কারণেই তিনি মেদিনীপুরের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচারের জন্য ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন করেন। সেই সময় তিনি দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুরের আদি ব্রাহ্ম সমাজের সভ্য হন। পরবর্তীকালে 1878 সালে যখন সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ যখন স্থাপিত হয় তিনি নেতৃবর্গের মধ্যে অগ্রগণ্য ব্যক্তির ভূমিকা পালন করেন।

ব্রাহ্মপদ্ধতি অনুসারে পুত্রের বিবাহ দেওয়ার জন্য সমাজ থেকে তাকে আলাদা করে দেয়া হয় তবুও তার সদিচ্ছাকে কখনোই দমন করা যায়নি।কলকাতায় বদলি হওয়ার সময় তিনি স্বীয় গ্রামের উন্নতি সাধনের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন। 1852 সালে গ্রামবাসীকে সমবেত করিয়া তিনি কোন্নগর হিতৈষিণী সভা নামে একটি সভা স্থাপন করেন। 1854 সালে তিনি একটি ইংরেজি স্কুল 1858 সালে একটি বাংলা স্কুল স্থাপন করেন।

এবং সেই সময় গ্রামবাসীদের ব্যবহার করার জন্য একটি সাধারণ পাঠাগার স্থাপিত করেন। তৎকালীন সময়ে তার স্ত্রী শিক্ষা উন্নয়নের জন্য তার অবদান অনস্বীকার্য। বহু বাধা বিপত্তি কাটিয়ে 1860 সালে নিজ প্রচেষ্টায় নিজ ভবনেএকটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করলেন। 1862 সালে তিনি নারীদের যথাযথভাবে শিশু পালনের জন্য একখানি গ্রন্থ রচনা করেন। তারই আবেদন অনুসারে হাজার 1858 সালের কোন্নগরে একটি ডাকঘর স্থাপিত হয়।

কোন্নগর এ ম্যালেরিয়ার যখন প্রবল প্রাদুর্ভাব হয় তখন তিনি নিজের একটি বাড়ি কে ডিসপেন্সারি ব্যবহারের জন্য বিনা ভাড়া তে দেন যাহাতে প্রচুর মানুষের উপকার হয়। 1883 সালে শিব চন্দ্রবাবু নিজের খরচে একটি হোমিওপ্যাথিক ঔষাধালয় স্থাপন করেন। সর্বশেষে আজকে কোন্নগর রেলস্টেশন হওয়ার জন্য তার অবদান আজও সাধারন মানুষ ভুলতে পারেনা।

শিবচন্দ্রেরই আবেদনে ১৮৫৬ সালে কোন্নগরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রেলস্টেশন নির্মাণ করে। এর আগে শ্রীরামপুর বা বালি স্টেশনে গিয়ে গাড়ি ধরতে হত কোন্নগরবাসীকে। সারা জীবন প্রচুর বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে এমনকি অবসরকালীন সময়ও তিনি তিনি নিকটস্থ বন্ধুবান্ধবের সাহায্যে দেশহিতকর কার্যে নিজেকে নিযুক্ত করে রেখেছিলেন।

এই খানে তেই সাধু পুরুষের 1890 সালে 12 ই নভেম্বর তিরোধান হয়। আজ ও কোন্নগরের মানুষ স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য শিবচন্দ্র দেবের নিরলস প্রচেষ্টার দ্বারা সৃষ্ট উন্নতির সাক্ষী হয়ে থাকে।