লুচির রোজনমাচা – কলমে কৌশিক নন্দী

কৌশিক নন্দী বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখনী পাঠকবর্গকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করে।

আদিকাল থেকে অন্তরের ছোট্ট কুটিরে লালিত-পালিত থাকা লুচির নাম শ্রবন করে ভোজনরসিক তামাম বাঙালির স্যালাইভা গ্রন্থি থেকে ক্রমাগত লালা রস বর্ষিত হতে থাকে -এটা কিন্তু চিরসত্য। লুচির একাধিপত্য প্রশ্নাতীত ভাবে বিরাজমান থাকে পেটুক বাঙালির জীবনে।

ফুলকো হোক বা বাসি, হেঁসেলে তার আবির্ভাবের খবরে উসখুস চিত্ত, উতলা স্বাদগ্রন্থি, মন খারাপের গুমোট সরে গিয়ে পলকে প্রাণে খুশির সু-বাতাস নিয়ে আসে । বাঙালির লুচিপ্রীতির ভূরি ভূরি নমুনা ছড়িয়ে আছে আদি-অন্ত কাল থেকে।

ছেলেবেলায় রোববারের জলখাবার মানেই ছিল লুচি- সাদাআলুচচ্চড়ি-জিলিপি বা কখনও-সখনও রসাল বোঁদে। ঠিক যেমন মা আমোদিনী তার ছোট মেয়ে পাখিকে শেখানোর জন্য বলতে থাকছে- লুচির ত্রুটি যেন না হয়!

“ময়ান দিবি ঘি দিয়ে, লুচি ভাজবি সাদা তেল আর ঘিয়ের মিশ্রণে।”
“নরম লুচির জল হইব গরম, আর ফুসফুসে লুচির জল হইব ঠান্ডা।”
“ময়দা মাখবি যতক্ষণ ময়দা এক্কেবারে তরল হইয়া যায়।”
“লেচি কাইট্যা, লেচিগুলিরে ভাল কইরা টিপ্যা হাতের গোড়ায় গোল পাকাইবি – তা হইলে দেখবি একটু শামুকের মতন দেখতে লাগব। যখন লুচি বেলবি, লুচির আকার গোল হইতে সুবিধা হইব। যখন লুচি ভাজবি, এই শামুকের মধ্যিখানটা বেশি কইরা ফুলব।”
“ভাজবার তেলটা য্যান খুব গরম, যাতে লুচি তক্ষুণি ফুইল্যা ওঠে।

লুচিগুলিরে হাতা দিয়া তেলের তলায় ডুবাইতে হইব, প্রথমে এক পাশ, তারপর অন্য পাশ। কিন্তু লুচি য্যান ধবধবে সাদা থাকে। লালচে রঙ হইলে ভাল লুচির ত্রুটি”। লুচির ইতিহাস জানতে গিয়ে দেখলাম যে লুচি কিন্তু দেশজ বা বাংলার কোন শব্দ নয়। কোন সংস্কৃত প্রাচীন কাব্যে লুচি বা লুচি কার মত কোন শব্দ রূপের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এমনকি বেদ-পুরাণ রামায়ণ-মহাভারত আয়ুর্বেদীয় গ্রন্থে আমরা লুচির কোন উল্লেখ পাইনি। কিন্তু পাল যুগের বিখ্যাত চিকিৎসক চক্রপাণি দত্ত একাদশ শতকে তভ ‘দ্রব্যগুণ’ গ্রন্থে আমরা লুচির সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা পাই।তিনি লিখেছেন, ‘সুমিতায়া ঘৃতাক্তায়া লোপ্‌ত্রীং কৃত্বা চ বেল্লয়েৎ। আজ্যে তাং ভর্জয়েৎ সিদ্ধাং শষ্কুলী ফেনিকা গুণাঃ।।’ যার বাংলা অর্থ হল, ‘গম চূর্ণকে ঘি দিয়ে মেখে, লেচি করে বেলে, গরম ঘিয়ে ভেজে তৈরী হয় শষ্কুলী, যার গুণ ফেনিকার মত।

‘ শষ্কুলী লুচির আদি রূপ। পাল যুগে তিন প্রকার শষ্কুলী বা লুচি প্রচলিত ছিল – খাস্তা, সাপ্তা ও পুরি। ময়ান দিয়ে ময়দার লেচি বেলে তৈরী হত খাস্তা, ময়ান ছাড়া ময়দার লেচি বেলে তৈরী হত সাপ্তা, ময়দার পরিবর্তে আটা ব্যবহার করলে তাকে বলা হত পুরি। মানিকলাল গঙ্গোপাধ্যায় রচিত ধর্মমঙ্গলে লুচিকে জনপ্রিয় খাদ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।তুলসী দাসের সময় ভারতে সর্বজনপ্রিয় শ্রেষ্ঠ খাদ্য রূপে পরিগণিত ছিল লুচি।

হিন্দিতে পিচ্ছিল বোঝাতে “লুচ” বা “লুচিলুচিযা” শব্দ ব্যবহার হয়। ঘিয়ে ভাজা লুচি হাতে ধরলে পিছলে পড়ে গেলে “লুচি” নামকরণ। দু একজনের মত এই শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ থেকে “লোচক” শব্দ থেকে। “লোচক” মানে চোখের তারা। চোখের তারার মত গোলাকার বলে এমন নাম। ১৮৫৪ সালে রামনারায়ণ তর্করত্ন রচিত ‘কুলীন কুলসর্বস্ব’ গ্রন্থে লুচিকে উত্তম ফলারের সর্বপ্রথম উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

লুচি পদ্ধতির যুগের পর যুগ পরিবর্তন হচ্ছে। রান্নার বইয়ের প পিতামহ পাক রাজেশ্বর তিনি লুচি তৈরি যদি অগ্রি দিয়েন শুষ্ক ময়দা মাখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে বরেন্দ্র রমজানের লেখিকা কিরণ লেখা লুচি তৈরিতে ময়দা কে শুধু ঘি দিয়ে মাখবার কথা বলেছিলেন। ঠাকুরমারা আবার লুচি র মধ্যে কোন দাগ না থাকার জন্য ময়দার সঙ্গে দুধ ব্যবহারের জন্য মায়েদেরকে নির্দেশ দিতেন। এই লুচির আকৃতি স্থান কাল ভেদে পরিবর্তিত হয়েছে মুর্শিদাবাদের কান্তনগর এর লুচি অনেকটা পদ্ম পাতার মত বড়।

পুজোয় ঠাকুরের জন্য তৈরি হয় মোটা প্রায় 18 ইঞ্চি ব্যাসের মত বৃহদাকার। দিনাজপুরের রাজবাড়ীতে রুচির বিশেষত্ব ছিল যে লুচি না ভাঙলে ফোলা অবস্থায় থেকে যেত। লুচি মানেই গোল, চিরাচরিত এই ধারণা ধাক্কা খেয়েছিল আবার মালদায়। সাইকেলে শহর থেকে ঘণ্টা খানেকের দূরত্বে সাদুল্লাপুর শ্মশানে পাওয়া যায় হাতিপায়া লুচি । কাঠের বারকোশে থাক থাক সাজানো থাকে পেটফোলা চৌকো তাকিয়ার মতো লুচি । সত্যিই যেন হাতির পা! ছোলার ডাল দিয়ে সেই লুচি তিনটের বেশি নিকেশ করা অসম্ভব।

আমাদের সস্তায় খাবার নগরী কলকাতাতেও আমাদের সবার প্রথমে মাথায় আসে উত্তর কলকাতার শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে ঠিক পাশেই এখনো বিরাজ করছে বিখ্যাত আদি হরিদাস মোদকের দোকান। প্রায় ২৫০ বছর আগে এই দোকান প্রতিষ্ঠা করেন হরিদাস মোদক। তারপর থেকে বংশ পরম্পরায় এই দোকানের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন মোদক পরিবার। হরিদাস মোদকের আকর্ষণ হল লুচি আর খোসা সমেত আলুর তরকারি। আহা কি স্বাদ ।আর এই স্বাদের সুমধুর আহবানে কে আসেন নি।

শ্রীরামকৃষ্ণদেব, রানি রাসমণি, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজা রামমোহন রায় প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।প্রায় ছয় প্রজন্ম ধরে এই দোকান আজও রমরমিয়ে চলছে। এখানে সমস্ত খাবার পরিবেশন করা হয় কলাপাতায়। কলাপাতায় লুচি আর আলুর তরকারি, তার টানেই উত্তর-মধ্য-দক্ষিণ কলকাতার অধিকাংশ মানুষ ভিড় করেন হরিদাস মোদকে।

তাই উত্‍সববাড়ির হুল্লোড় থেকে শীতের পিকনিক বা দেবতার ভোগ, বাঙালির বারোমাস্যায় তার চিরন্তন বিচরণ। তাই লুচির গল্প কখনো শেষ হয়না কখনো শেষ হবেও না। তাই লালা গ্রন্থি থেকে লালা বর্ষণ চলতেই থাকবে এর কোন বিরাম নেই -লুচি জিন্দাবাদ অমর রহে।

error: Content is protected !!