সুন্দরবনের লোকসংগীত মুক্তাঙ্গন – কলমে সায়ন দাস মুখার্জি

সায়ন দাস মুখার্জী বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।

অবিভক্ত বাংলার দক্ষিন সীমানায়, গঙ্গা- ব্রক্ষ্মপুত্রের মোহনায় এবং বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূল বরাবর বৃহৎ আয়তনের ব-দ্বীপের সৃষ্টির ইতিহাস যা পাওয়া যায় তা অতি বড় চমকপ্রদ। কয়েক হাজার বছর ধরে গঙ্গা ব্রক্ষ্মপুত্রের বিপুল জলরাশি আনছে বালি, পলি, মাটি, নুড়ি-পাথর আরও কত কি বর্জ্য পদার্থ। সবেরই এক গন্তব্য নদী মোহনায় ও বঙ্গোপসাগরের উত্তর উপকূল।

নদীর মোহনায় ক্রমাগত পলন জমে জমে সৃষ্টি হয়েছে বেশ কিছু ছোটো বড় অসংখ্য দ্বীপ যা আজ বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ রূপে চিহ্নিত হয়েছে। প্রকৃতির আপন বৈশিষ্টে এখানে সৃষ্টি হয়েছে অতুলণীয় সৌন্দর্যেভরা শীর্ষস্থানীয় ম্যানগ্ৰোভ অরণ্য। বিশ্বের মানচিত্রে আজ ” সুন্দরবন ” নামে সর্বাধিক পরিচিত। এখানকার জল, মাটি, পরিবেশ, আবহাওয়া সব কিছুই অনন্য। এর ফলে এখানে বিশেষ ধরনের ভৌগোলিক পরিমন্ডল গড়ে উঠেছে।

এসব কারনে এখানে বিশেষ প্রকৃতির বৃক্ষ ও উদ্ভিদ, কীট- পতঙ্গ, বন্যপ্রানী, পক্ষিকূল, সরীসৃপ জন্ম নিয়েছে। আর মানুষ এদেরকেই সঙ্গী করে বসবাস করে দীর্ঘ কাল ধরে। বিশ্বের অন্য কোথাও ম্যানগ্ৰোভ অরন্যে বাঘের বসবাস নেই। এখানে জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ, গাছে বিষধর সাপ ও আকাশে শকুন। এই অঞ্চলের মানুষদের জীবনে অহরহ বিপদ ও নিঃসঙ্গ তাই একমাত্র প্রধান সঙ্গী।

এতসব বহুমুখী স্বাতন্ত্রতার মিলিত উপাদান সমূহ সুন্দরবনের মানুষের সমাজ জীবনের বৈশিষ্ট। এখনকার বিশাল আয়তনের নদীগুলির দুই তীরের সীমাহীন সবুজ অরন্যের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী যে কোনো মানুষকে মুগ্ধ করবেই। সুন্দরবনে ভ্রমনরত যে কোনো বিদেশীদের কাছে সুন্দরবন শ্যামশ্রী ও নয়ন মণিহার দৃশ্যপট বার বার ধরা পড়েছে। বহু বৈশিষ্টে ভরা সুন্দরবন আজ পৃথিবীর অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ম্যানগ্ৰোভ অরন্য হিসাবে ১৯৮৭ সালে ১১ই ডিসেম্বর UNESCO দ্বারা স্বীকৃত।

বিশাল আয়তনবিশিষ্ট সুন্দরবনের বাদাবন সাফ করে কৃষিজমি উদ্ধার এবং সেখানে বসতি স্থাপনের দ্বারা রাজস্ব পরিকল্পনার মুঘল রাজত্বে যৎসামান্য উদ্যেগ তেমনি ফলপ্রসুত হয়নি। পরবর্তী অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম পর্বে ব্রিটিশ শাসন ব্যাবস্থায় বিশেষ কার্যকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়। অরন্য সাফের কাছে আদিবাসীদের নিয়োগ করা হয়।

তৎকালীন বিহারের ঝাড়খন্ড ও ছোটোনাগপুর অঞ্চল থেকে মুন্ডা, সাঁওতাল, ওরাও ও ভূমিজ শ্রেনীর আদিবাসীরা সাফ করিয়ে বসবাস শুরু করে। এদের সঙ্গে সঙ্গে মাহালী, কোরা, বেদিয়া শ্রেনীর কিছু মানুষ এখানে বসবাস শুরু করে। এদের বাদ দিয়ে বহু সংখ্যক নিম্নশ্রেনীর হিন্দু ও মুসলমান এ অঞ্চলে জঙ্গল সাফ করে বসবাস আরম্ভ করে দেয়। এভাবেই এই বিশাল ভূখন্ড কালে কালে জমজমাট জনপদ গড়ে ওঠে। ইতিহাস বলে কলকাতাও একসময়ে সুন্দরবনে আবদ্ধ ছিল। এর প্রচুর প্রমান পাওয়া যায়।

ভিন্ন ভিন্ন ভূখন্ডের মানুষগুলো ধীরে ধীরে নিজ গোষ্ঠীর মধ্যে গড়ে তুলল এক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল। পৃথক পৃথক মানব সংস্কৃতির ধারায় সৃজন হল লোক-সংস্কৃতি। নানান কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ধারায় উদ্ভব ঘটলো লোক সংগীত। লোক ধর্ম, লোক গীত, লোক উৎসব, লোক নৃত্য, লোকশিল্পী ইত্যাদি। এসবই সুন্দরবনের বৃহত্তম জনজীবনের প্রতি ছবি। এ অঞ্চলের ভৌগলিক পরিবেশ, লৌকিক আচার, অনুষ্ঠান , সামাজিক, অর্থনৈতিক , ধর্মীয় বিষয় সমূহ লোকসংগীতের অন্যতম উপাদান। লোকসংগীত সৃষ্টি হয়েছে নিজ নিজ আঞ্চলিক ভাষায়। বিকশিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ধারায় ও আঙ্গিকে। লোক সংগীতের সৃষ্টি লোক জীবন থেকেই।

লোক সংগীতের ক্ষেত্রে বাউল, ভাটিয়ালী, সারি ও জারি গান, কবিগান, মনসা ও শীতলা ভাসান গান, পালা গান, পীরগান, গাজীদের গান ইত্যাদী এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। এখানকার আঞ্চলিক ভাষায় লোকজীবনের সুখ-দুঃখ, আশা নিরাশা অভিব্যাক্তি মূর্ত হয়ে ধরা পড়ে লোকসংগীতে। সুন্দরবনের বনে, জঙ্গলে, পথে প্রান্তে প্রাত্যাহিক জীবনে চলার পথে এক ভয় জাগানো এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কের পরিবেশে বেচেঁ থাকার তাগিদে লোকসংগীতের সৃষ্টি করেছে। জীবনে নিরাপত্তাহীনতার কারনে সুন্দরবনের মানুষদের মনের উপরে এক নিরাসক্ত, নৈবক্তিক, উদাস মানসিকতার জন্ম নিয়েছে। এক অজানা উদাসী ভাব সর্বদাই আচ্ছন্ন করে রাখে এদের জীবনকে ঘিরে।

এমন এক উদাসী জীবন থেকেই ভাষা বেরিয়ে আসে, সুর ও সৃষ্টি হয়। জলাভুমি দিয়ে ঘেরা সুন্দরবনে জল আর শুধুই জল। নদীতে মাঝিরা নৌক নিয়েই চলে। ক্লান্তি, অবসন্নতা, দেহমনকে অবশ করে দেয়। নদীতে চলার পথে নিজস্ব জনমানব শূন্য প্রকৃতি। মনটা কেমন যেন শূণ্যতায় ভরে যায়। এমনি এক মূহুর্তে মাঝি গান গেয়ে ওঠে~ ‘ ও নদী রে, পাইনে তোর সীমা।’….. প্রকৃতি ও পরিবেশ মাঝির গান ও সুর দুইই রচনা করে দেয়।
ভাটিয়ালী গান ও নৃত্য

ভাটিয়ালি গান:- সুন্দরবনের দ্বীপভূমিতে লোকসংগীতের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে ভাটিয়ালী সংগীত। ভাটার টানে নৌকো এগিয়ে চলেছে। নৌকার মাঝি আনন্দে গান ধরেছে~
‘ নদীর এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে
এই তো নদীর খেলা রে ভাই
নদীর কূঋ কিনারা পাইলাম না
সকালবেলায় আমি রে ভাই
ফকির সন্ধে বেলা
এই তো নদীর খেলা রে ভাই
এই তো নদীর খেলা,,,,,,,,,,,,”

অজানা অচেনা মানুষের উদ্দেশে মাঝি তার প্রানের আকৃতি গানের মাধ্যমে প্রকাশ করে। অজানা বন্ধুর প্রতি আবেদন জানায়~ ” কোন গেরামের নাওরে ভাই
কোন গেরামে যাও
একখানা কথা কও ন কও
পান খেয়ে যাও……”
সুদীর্ঘ কাল ধরে বাংলার সুন্দরবন অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে ভাটিয়ালি সংগীতগুলি। এই সংগীত মানুষের মনের গভীরে গভীরভাবে যুক্ত। বাস্তবকে নিয়েই জীবনের দর্শন খোঁজার সাধনা। একটি গান উক্তিলিখিত করলাম~
” ও নদীরে, একটি কথা শুধাই আমি তোমারে,
বল কোথায় তোমার দেশ, তোমার নাইকি চলার বেশ, ও নদীরে…”

বাউল:- সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ পর্বে গ্ৰাম বাংলায় বাউল সংগীতের আবির্ভাব হয়। দেহমন্দিরে প্রানের ঠাকুর খোঁজাই গানের মধ্য দিয়ে বাউল সাধনার লক্ষ্য। সুফি ধর্ম ও সহজিয়া বৈষ্ণব মতের সম্মেলনে বাউল মতের সৃষ্টি। গ্ৰাম বাংলার সমাজ সংস্কৃতি ও ধর্মে বাউল সম্প্রদায়ের ও বাউল সংগীতের একটি বিরাট স্থান রয়েছে। মূলত কৃষিজীবী ও তাঁতি সম্প্রদায়ের মধ্যে বাউলদের প্রভাব বিশেষ লক্ষণীয়। হিন্দু ও মুসলিমের গোঁড়া পন্থীরা কোনোদিন বাউলদের সুনজরে দেখেনি।

ড.সতীশ চন্দ্র মিত্রের রচিত ‘ যশোর খুলনার ইতিহাস ‘ গ্ৰন্থ থেকে জানা যায় অধিকাংশ বাউল সাধকদের জন্ম কুষ্টিয়া যশোর জেলার অধুনা বাংলাদেশে ভুক্ত। এর পার্শবর্তী জেলাগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। পল্লির বিভিন্ন উৎসবে বাউলরা যোগদান করে ভাব বিনিময় করে তোলে। ব্রিটিশ আমলে পূর্ব বাংলার ফরিদপুরের সুরেশ মেলা , গোপালগঞ্জের ওড়া কান্দির হরি ঠাকুর মেলায় বাউলদের সমাবেশ ঘটত। প্রাত্যাহিক জীবনে নানা অভিজ্ঞতা ও কার্যাবলী বাউল গানের মধ্যে রূপক ভঙ্গীতে প্রকাশ পেয়েছে। বাউল সম্প্রদায়ে্র উদ্দেশ্য মানব ধর্মের পথে থেকেই মানবোন্নয়ন। ‘ সবার উপরে মানুষ সত্য- তাহার উপরে নাই ‘ এটাই তো সার কথা। ‘দেহতত্ত্ব’ বাউল গানেই এমনভাবে রূপক হিসাবে তুলে ধরেছে যার মধ্য দিয়ে সাধারন কৃষিজীবী মানুষগুলোর অন্তরকে স্পর্শ করেছে~
” ভাবের ঘরে যে বাস করে গো
তার কাছে করণ সারা
ভাব না জেনে সাধন করে গো
সে পাবে না অধরা।”

সে যুগে যশোর, খুলনা, বরিশাল, ২৪ পরগনার সুন্দরবন অঞ্চলে অসংখ্য বাউল গান গেয়ে বেড়াত। বাউল গানের প্রচলন সেদিন সুন্দরবনের কৃষিজীবী মানুষদের মধ্যে বিশেষ ভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। বাউলদের পাশাপাশি বৈরাগী সম্প্রদায়ের মানুষেরা গোপী যন্ত্র বাজিয়ে বাউল দেহতত্ত্ব গেয়ে সকলকে মাতিয়ে তুলত। সে যুগে ২৪ পরগনার বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ করে বারাসাত, কামদেবপুর, বনগাঁ, গাইঘাটা এলাকায় প্রচুর বাউলের আখড়া ছিল।

অষ্টক:- বসন্তকালীন সংগীত হিসাবে রাধাকৃষ্ণ, শিবদূর্গা, রামায়ন ও মহাভারতের কাহিনী নিয়ে পালা গান গেয়ে থাকেন। অষ্ট সখী সহযোগে নাচ গান হয়। তাই একে অষ্টক বলা হয়। যশোর, খুলনা জেলায় অষ্টক গানের প্রচলন যথেষ্ট ছিল। তৎকালীন সমাজে পণপ্রথা, সাম্প্রদায়িকতা ও আরও কিছু সমস্যা নিয়ে কু-প্রথার বিরুদ্ধে এরা গান গেয়ে থাকে। আসরে পাঁচালির সুরে গান গাওয়া হত। দূর্গা বিসর্জন, দোল, চড়ক প্রভৃতি উৎসবে অষ্টক গানের প্রচলন সুন্দরবনে দেখা যায়।

রূপভান:- খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর এলাকায় সব থেকে আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় পালা গান হিসাবে বহুল প্রচলিত ছিল। পল্লী সমাজের সুখদুঃখ জীবনের ঘটনা বহুল কাহিনীকে কেন্দ্র করে উজ্জীবিত হত। পরে ধীরে ধীরে পূর্ববঙ্গের সুন্দরবন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল।
আদিবাসী গান:- আদিবাসীদের সুখ-দুঃখ কে কেন্দ্র করে নিজেদের আঞ্চলিক ভাষায় (মিশ্র ভাষা) তারা বিভিন্ন উৎসবে গান গাইত ~ ” পড়িল ভাদর মাস
নাহিলে নাহি আর আশ
রাতদিন কেহ না দেখিয়ে
মোর পরাণ যায়।ভাদর চলিল সই রে….

আধুনিক নাগরিক সভ্যতা মানুষকে লোক সংস্কৃতি ও লোক সংগীতের পরিমন্ডল থেকে অনেকখানি বের করে এনেছে। এর ফল হয়েছে ভয়ঙ্কর বিপর্যয়কর। সুন্দরবন সহ গ্ৰামবাংলার সর্বত্র আজ লক্ষ্য করা যাচ্ছে লোক সংগীত, লোক সংস্কৃতি দ্রুতলয়ে সমাজ থেকে বিলুপ্তির পথে।তাই আজ সমাজ বিজ্ঞানীদের সময় এসেছে কিভাবে এই পরম্পরাগত সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনা যায়।

তথ্যসূত্র:
১) ড. উপেন ভট্টাচার্য – বাংলায় বাউল
২) ড. গিরিন্দ্রনাথ দাস – পীর সাহিত্যের কথা
৩) সতীশ চন্দ্র মিত্র – যশোর খুলনার ইতিহাস

error: Content is protected !!