কুশান মুদ্রায় ভারতীয়, গ্রীক ও ইরাণীয় দেব-দেবী -কলমে সায়ন দাস মুখার্জি

সায়ন দাস মুখার্জী বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।

মহান ভারতবর্ষে স্বর্ণমুদ্রা প্রথম চালু করেন কুষাণ সাম্রাজ্যের সম্রাটগণ। সম্ভবত কুষাণ সম্রাট বীম কদফিসেস সর্বপ্রথম স্বর্ণমুদ্রা জারি করেন। তাঁর আমলের মুদ্রার মুখ্য দিকে একটি উঁচু বেদিতে যজ্ঞরত রাজার চিত্র দেখা যায়। আর কনিষ্ক ও হুবিষ্ক এর আমলের স্বর্ণমুদ্রায় নানান বিচিত্র নকশা, দেবদেবী ও নানান চিহ্নের ব্যবহার দেখা যায়। প্রাচীন বাংলায় কুষাণ সাম্রাজ্যের বহু কুষাণ-মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। বাংলায় কুষান সাম্রাজ্যের প্রভাব অতটা ছিল না তবে বাণিজ্যিক কারণে বাংলায় কুষান সাম্রাজ্যের মুদ্রা বুকে পড়ে। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কুষাণ সম্রাট কনিষ্ক, হুবিষ্ক ছাড়াও মহানাদ কুষাণ, প্রথম বাসুদেব ও দ্বিতীয় বাসুদেবের স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গিয়েছে। কুষাণ সাম্রাজ্যের স্বর্ণমুদ্রা ছাড়াও প্রচুর তাম্র-মুদ্রাও পাওয়া গেছে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে। ভীম কদফিসেস, কনিষ্ক, হুবিষ্ক ও প্রথম বাসুদেবের তাম্র-মুদ্রাও পাওয়া যায়।

এবার কুষান সাম্রাজ্যের শুরুবাদ নিয়ে আলোচনা করবো। খ্রিষ্টপূর্ব ২য় শতাব্দীর প্রথম দিকে শুংনু নামক এক উপজাতির সহিত তাদের প্রতিবেশী ইউয়েচি নামক অপর এক উপজাতির সংঘর্ষ লাগে। তাই সংঘর্ষে ইউয়েচি উপজাতি হেরে যাওয়ায়, ইউয়েচি উপজাতির লোকেরা পশ্চিমদিকে সরে যেতে থাকে। তারা ইলি নদীর উপত্যকা পেরিয়ে ১৪৫-১২৫ খ্রীষ্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে তারা অক্ষু নদীর তীরে ব্যাকট্রিয় ও পার্থিয়ায় বসতি স্থাপন করে। পরে তারা সেই জায়গা ত্যাগ করে কাবুল উপত্যকা পেরিয়ে পাঞ্জাবে বসতি স্থাপন করে। এই উপজাতির নেতা কিউ-সিউ-কিও সমগ্র উপজাতির প্রধান হয়ে বসে। তার নাম থেকেই নাম হয় কিউই-শাং বা কিউ-সুয়াং বা কুষাণ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা শুরু হয়। ধীরে ধীরে ভারতবর্ষের নানান অঞ্চলে আক্রমণ চালিয়ে মধ্য আফগানিস্থান, গান্ধার এবং নিম্ন সোয়াত উপত্যাকা অধিকার করেন । তার বংশধরগণ উত্তর ভারতের রাজ্য বিস্তার করে, যে উত্তর ভারত এতদিন পর্যন্ত বিদেশি অভিযান এড়িয়ে যেতে পেরেছিল। কুশান গন পূর্ব বারানসি পর্যন্ত এবং পশ্চিমে ভারতের সীমান্ত ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে এইভাবে তারা যে সাম্রাজ্য গড়ে তোলে তা এক শতাব্দীর চেয়েও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়েছিল।

কুশান সাম্রাজ্যের সম্রাটদের মধ্যে কুজুল কদফিসেসের তাম্রমুদ্রা ভারতীয় কুশানদের প্রস্তুত সবচেয়ে প্রাচীন মুদ্রা। কুশানদের সমস্ত মুদ্রাগুলি মধ্যে সর্ব প্রাচীন মুদ্রাটির মূখ্যদিকে ব্যাকট্রিয় নরপতি হেরমেস এবং গৌণ দিকে হেরাক্লেস এর আবক্ষ প্রতিমূর্তি চিত্রিত রয়েছে।

কুজুল কদফিসেসের প্রথম জীবনের বেশ কিছু মুদ্রার এক পিঠে বাসিলেওস স্তিরোস্সু এর্মাইওউ’ কথাটি উৎকীর্ণ রয়েছে, যা ইন্দো-গ্রিক শাসক এর্মাইওস সোতেরের নাম ও উপাধি চিহ্নিত করে। মুদ্রাগুলিতে দিয়াদেম পরিহিত এর্মাইওস সোতেরের প্রতিকৃতিও মুদ্রিত রয়েছে। এই মুদ্রাগুলির অপর পিঠে গদা হাতে সিংহচর্ম পরিহিত হেরাক্লিসের চিত্র ও খরোষ্ঠী লিপিতে “কুজুল কসস কুষাণ যবুগস ধর্মতিধস” লেখাটি উৎকীর্ণ রয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে, এই মুদ্রাগুলির সহিত রোম সম্রাট আউগুস্তুরসের মিল রয়েছে।

কুজুল কদফিহেসের পরবর্তী রাজা ভীম কদফিসেস তিন ধরনের মুদ্রা চালু করেন, সেগুলি হল – দুই-দিনার, একদিনার এবং সিকি দিনার । সিকি দিনার মুদ্রাটি খুব দুর্লভ। মুদ্রার মূখ্য দিকে নিজের ছবি অঙ্কিত রয়েছে আর মুদ্রার বিপরীত দিকে সুদীর্ঘ ত্রিশূলধারী শিবের চিত্র অঙ্কিত দেখা যায়। আবার শিবের বাহন ষাঁড়ের চিত্রও দেখা যায়। তিনি চীনদেশ থেকে আগত হয়েও ভারতীয় পরিবেশ ও সংস্কৃতির সাথে মিশে গিয়েছিল। এছাড়া নিজে পরবর্তীতে শৈব ধর্ম গ্ৰহন ও প্রচার করেছিলেন। কুষাণদের প্রচলিত মুদ্রার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নৃপতি ভীম কদফিসেস গ্রীক ও খরোষ্ঠী লিপিতে দ্বিভাষিক মুদ্রার প্রচলন করেন ।

ভীম কদপ্সিসের পরবর্তী শাসক প্রথম কনিষ্কের মুদ্রায় দেখা গেছে বা হাতে একটা বর্ষা ধরে যজ্ঞবেদীর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, পরিধানে লম্বা শালোয়ার ধরনের পোশাক এবং মাথায় টুপি। মুদ্রায় গ্রীক ও খরোষ্ঠী দুই ভাষাতেই উৎকীর্ণ রয়েছে। তার প্রচলন করা মুদ্রার ওপর লেখা থাকত ‘ব্যাসিলেয়াস ব্যাসিলিয়ন কনিষ্কৌ’ । এই সব মুদ্রার বিপরীত দিকে হেলিওস , সালেন এবং হেপহাইস্টোস এই তিন জন দেবতার ছবি চিত্রিত থাকে। তবে চিত্রাঙ্কন রীতি অনুযায়ী ইরানীয় সংস্কৃতির ছাপ লক্ষ্য করা যায়। তার মুদ্রায় মধ্য-ইরাণী ও শক ভাষার প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। কনিষ্কের মুদ্রায় ‘শাওনানো শাও কনিষ্ক কোশানো ‘ লেখা আছে।

কুশানদের মুদ্রায় বহু গ্ৰীক, ভারতীয় ও ইরানি দেবদেবীর মূর্তি অঙ্কিত রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ভারতীয় দেবদেবীদের যধ্যে উল্লেখযোগ্য শিব, বুদ্ধ, সূর্য, ব্রক্ষ্মা, দূর্গা, কার্তিক, লক্ষ্মী ইত্যাদি। আর ইরানী দেবদেবীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিহির (সূর্য), মাহ (চন্দ্র), মাজদা, অত্র, ওয়াদো(বায়ু), ওরলাগ্নো (যুদ্ধের দেবতা) , লুহ্রাস্প(জীবজন্তুর দেবতা), ভোহু-মানহ, অ্যাথশো(অগ্নি), ফ্যারো(ঐশ্বর্যের দেবতা), মাজদা( জোরাসট্রিয়ান ধর্মের সর্বোত্তম দেবতা ), নানিয়া (প্রকৃতির দেবী) এবং আর্দোক্সো (হিন্দুদের লক্ষ্মীদেবীর অনুরূপ দেবী) পূর্ববর্তী মৃতের মুদ্রায় যে শিবের চিত্র থাকতো সেই একই ছবি দেখা গেছে হবেশ নামক মুদ্রায়। এছাড়া শকমানো বদ্দো অর্থাৎ শাক্যমুনি বুদ্ধের প্রতিচ্ছবি থাকত।
কণিষ্কের গ্রিক মুদ্রাগুলির এক পিঠে তার প্রতিকৃতি সহ গ্রিক লিপিতে বাসিলেউস বাসিলেওন কানিষ্কোউ কথাটি উৎকীর্ণ রয়েছে। মুদ্রাগুলির অপর পিঠে হেলিয়স, সেলেন, আনেমোই এবং হেফাইস্তোস ইত্যাদি গ্রিক পৌরাণিক দেবদেবীর চিত্র ও নাম উৎকীর্ণ রয়েছে।

কণিষ্কের আবিষ্কৃত ভারতীয় শৈলীর মুদ্রাগুলোর মধ্যে বৌদ্ধ মুদ্রাগুলির সংখ্যা অত্যন্ত দুর্লভ। এই সকল মুদ্রাগুলির এক পিঠে কণিষ্কের চিত্র ও শাওনানোশাও কানিষ্কি কোষানো” লেখা আছে। এছাড়া অপর পিঠে গৌতম বুদ্ধ বা মৈত্রেয় বুদ্ধের চিত্র স্থান পেয়েছে, তাই আগেই বলেছি।

কণিষ্কের যে সকল তাম্র মুদ্রায় মৈত্রেয় বুদ্ধের চিত্র স্থান পেয়েছে, সেই মুদ্রাগুলিতে মেত্রাগো বোদ্দো উৎকীর্ণ রয়েছে। এই মুদ্রাগুলোয় মৈত্রেয় বুদ্ধ কারুকার্য্যমণ্ডিত সিংহাসনে হাঁটু মুড়ে বসে রয়েছেন। তার হাতে একটি জলের পাত্র রয়েছে ও হাতটি অভয় মুদ্রার ভঙ্গীতে রয়েছে।

কনিষ্কের পর কুষাণ সম্রাট হন হুবিষ্ক । কনিষ্কের মতো তাঁর মুদ্রাতে ইরানি দেবদেবীর প্রতিমূর্তি দেখা গেছে । এছাড়াও হুবিষ্ক আহুরা-মাজদা (মিশরীয় দেবতা), আশাইকসোহো (সত্যের দেবতা) ,ওয়াক্সাহো (অক্ষু নদীর দেবতা ), এবং শাওঁরেওরা (রাজকীয় দেবতা ) প্রভৃতি নতুন নতুন দেবতার প্রতিমূর্তি পাওয়া গেছে তাঁর মুদ্রায় । ভারতীয় দেবদেবীর মধ্যে হুবিস্ক শিবকে ওয়েশো রূপে মুদ্রায় অঙ্কিত করেছেন। এছাড়া শিবের সাথে মা দূর্গাকেও উমা রূপে ও কার্তিককে বেশিরভাগ মুদ্রায় দেখা যায় ওম্মা’ নামে।
কুষান সম্রাট হুবিষ্কের পর সম্রাট হন বাসুদেব। কনিষ্কের মত বাসুদেবের স্বর্ণমুদ্রার নিজের চিত্র চিত্রিত রয়েছে। তবে বাসুদেবের মুদ্রায় বাসুদেবকে ত্রিশূল হাতে চিত্রিত করা হয়েছে। সম্রাট বাসুদেবের মুদ্রায়ও নানান ভারতীয় ও ইরানীয় দেবদেবীদের ছবি চিত্রিত রয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল, আর্দোক্সো দেবী (দেবী লক্ষ্মী) দেবীর বাঁহাতে চূড় আকৃতির পাত্রে শস্যাদি ও ডানহাতে রাজমুকুট রয়েছে এবং ব্রাক্ষ্মী লিপিতে লিখিত রয়েছে।

হিন্দু দেবদেবীর মধ্যে লক্ষ্মী দেবীর প্রথম মূর্তি আমরা কুশান মুদ্রাতেই দেখতে পায়। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হল, একই বংশের এত দেশের সংস্কৃতি র ছাপ পড়লো কিভাবে? ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রথম স্বর্ণ মুদ্রা প্রচলন করেছিলেন একমাত্র কুশানরাই।

তথ্যসূত্র: URL

#sayandasmukherjee2p

error: Content is protected !!