কালী কথা ও তত্ত্ব – বিভাগ- দক্ষিণাকালী – কলমে সায়ন দাস মুখার্জি

সায়ন দাস মুখার্জী বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।

এই মূর্ত্তিতত্ত্ব অতীব নিগূঢ় রহস্যবস্তু। আজ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর আগে নবদ্বীপের বিশিষ্ট তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ এই কালীমূর্তির প্রচলন করেছিলেন। মহাকাল সংহিতা অনুসারে আদ্যাকালী দক্ষিণাকালী। দক্ষিণদিকে যমের অবস্থান, কালী নামে ভীত হয়ে সে ছুটে পালায়, এজন্যেই ত্রিজগতে কালিকাদেবী ‘দক্ষিনা’ নামে পরিচিতা।

এ সম্পর্কে তন্ত্রতত্ত্বের আলোচনা গভীর তাৎপর্য পূর্ণ। শিবচন্দ্র লিখেছেন —“পুরুষের নাম দক্ষিন (দক্ষিনাঙ্গ স্বরূপ বলে) এবং শক্তির নাম বামা (বামাঙ্গ স্বরূপ বলে)। যতদিন এই বাম আর দক্ষিন, স্ত্রী ও পুরুষ সমবলে অবস্থিত, ততদিন সংসার বন্ধন। সাধনার প্রখর প্রভাবে বামাশক্তি জাগরিতা হলে তিনি দক্ষিনশক্তি পুরুষকে জয় করে তদুপরি স্বয়ং দক্ষিণানন্দে নিমগ্না হয়েন অর্থাৎ কি বাম, কি দক্ষিন উভয় অংশই যখন তাঁর প্রভাবে পূর্ণ হয়ে যায়, তখন সেই কেবলানন্দরূপিণী জীবের মহামোক্ষ প্রদান করেন। তাই ত্রৈলোক্য মোক্ষদা মায়ের নাম দক্ষিনাকালী।”

আবার, স্বয়ং শিব বলেছেন –“যজ্ঞাদি কর্মের শেষে দক্ষিনা যেমন যজ্ঞাদিকে সফল করে তেমনি হে দেবী! কালিকা সকলকে বাঞ্ছিত ফল এবং মুক্তি দেন বলে সেই বরবর্ণিনীকে দক্ষিণাকালী বলা হয়।”

কৃষ্ণবর্ণা — দক্ষিনাকালী কৃষ্ণা। ধ্যানে তাঁকে মহামেঘপ্রভাং শ্যামা এবং অঞ্জনাদ্রিনিভা বলা হয়েছে।
কামাক্ষ‍্যাতন্ত্রে আছে –কালী সদা কৃষ্ণবর্ণা এটি আগমের নির্ণয় —
কৃষ্ণাবর্ণা সদা কালী আগমস্যেতি নির্ণয়ঃ।
–কামাক্ষ‍্যা তন্ত্র,পঃ ৯

কালীর বর্ণ কৃষ্ণ কেন সে সম্বন্ধে মহানির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে–শ্বেত পীতাদি বর্ণ যেমন কৃষ্ণ বর্ণে বিলীন হয়ে যায় তেমনি সর্বভূত কালীর মধ্যে প্রবেশ করে অর্থাৎ বিলীন হয়। এইজন্য যাঁরা মোক্ষের উপায় ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেছেন তাঁরা নির্গুণা নিরাকারা কল্যাণময়ী কালশক্তির কৃষ্ণাবর্ণ নিরূপণ করেছেন –
স্বেতপীতাদিকো বর্ণে যথা কৃষ্ণে বিলীয়তে।
প্রবিশন্তি তথা কাল্যাং সর্বভূতানি শৈলজে।।
অতস্তস্যাঃ কালশক্তের্নিগুণায়া নিরাকৃতেঃ।
হিতায়াঃ প্রাপ্তযোগানাং বর্ণঃ কৃষ্ণো নিরূপিতঃ।।
–মহানির্বাণতন্ত্র ১৩/৫-৬

“পরাশক্তি অরূপা সুতরাং বর্ণহীন। যেখানে সর্ববর্ণের অভাব তাহাই নিবিড় কৃষ্ণাবর্ণ, একথা বিজ্ঞানসম্মত। বিজ্ঞান আরও বলে যে-জ্যোতিঃ আমাদের চক্ষু ধারনা করিতে পারে না, তাহাই নিবিড় কৃষ্ণবর্ণ দেখায়। তাই মহাজ্যোতিঃ কালী কৃষ্ণাবর্ণা। কিন্তু জ্ঞাননেত্রে মহাজ্যোতিঃ রূপে দৃশ্য হন।”

কর্পূরাদিস্তোত্রের প্রথম শ্লোকে কালীকা দেবীকে বলা হয়েছে ধ্বান্তধারাধররুচিরুচিরা অর্থাৎ নীলমেঘের মতো মনোজ্ঞা। এর ব্যাখ্যায় বিমলানন্দস্বামী লিখেছেন দেবী শুদ্ধসত্ত্ব গুনাত্মক ঘনীভূত তেজোময়ী এবং চিদাকাশ। এইজন্য তাঁর নীলবর্ণ চিন্তা করতে হয় —
“ধ্বান্তধারারুচিরুচিরে শুদ্ধসত্ত্বগুনাত্মক ঘনীভূততেজোময়ত্বাৎ তথা চিদাকাশত্বাচ্চ নীলবর্ণচিন্তনীয়ে।”

   --কর্পূরাদিস্তোত্র ১ম শ্লোকের স্বরূপ ব্যাখ্যা এখানে নীলবর্ণ অর্থ কৃষ্ণবর্ণ। কেন না স্বামীজী আপন ব্যাখ্যার সমর্থনে যোগবাশিষ্ট থেকে যে-বচন উদ্ধার করেছেন তাতে আছে--

শিবর্যোব্যোমরূপত্বাদসিতং লক্ষ্যতে বপুঃ। (উক্ত স্বরূপ ব্যাখ্যা, পাদটীকা)
শিব ও শিবার ব্যোমরূপ বলে তাঁদের বপু অসিত অর্থাৎ কৃষ্ণ।
ঋগবেদে আছে অগ্রে অর্থাৎ সৃষ্টির পূর্বে ছিল তমঃ।সেই তমসায় সমস্তই আচ্ছন্ন ছিল —
তমঃ আসীত্তমসা গূঢ়মগ্রে।
–ঋকবেদ ১০/১২৯/৩

মৈত্রায়ণী-উপনিষদেও বলা হয়েছে সৃষ্টির পূর্বে একমাত্র তমঃ ছিল —
তমো বা ইদমেকমাস। -মৈ-উপঃ, ৪র্থ প্রপাঠক।
এই আদি তমঃই কালী। মহানির্বাণতন্ত্রে সদাশিব দেবীকে বলেছেন –সৃষ্টির পূর্বে বাক্য ও মনের অতীত তমোরূপে তুমি একা বিরাজমানা ছিলে। আবার বলেছেন –প্রলয়ের পর তুমি আবার তোমার নিরাকার, বাক্যের অতীত ও মনের অগম্য তমোরূপ স্বরূপ প্রাপ্ত হও এবং তখন অদ্বিতীয়া তুমিই অবশিষ্ট থাক–
সৃষ্টেরাদৌ ত্বমেকাসীৎ তমোরূপমগোচরম।
পুনঃ স্বরূপনাসাদ্য তমোরূপং নিরাকৃতিঃ।।
বাচাতীতং মনোহগম্যং ত্বমেকৈবাবশিষ্যসে।
—মহানির্বাণতন্ত্র

কালী দিগম্বরী বা দিগবস্ত্রা। বস্ত্র আবরণ। সব চেয়ে সূক্ষ্ম আবরণ মায়া। কালী পূর্ণব্রহ্মময়ী বলে মায়াতীতা। তাই তিনি আবরণশূন্যা দিগম্বরী।
এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলার আছে, অনেক অতত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তি কালীমূর্ত্তি দিগম্বরী বলে নাসিকা কুঞ্চিত করেন। তাঁরা জানেন কিনা জানিনে, মেডোনার অনেক নগ্নচিত্র অঙ্কিত হয়েছে। পোপের আপন গীর্জা সিসটাইন চ্যাপেল – মাইকেল এঞ্জেলো অঙ্কিত লাস্ট জাজমেন্ট নামক প্রখ্যাত ছবি আছে। তাতে যীশুখৃষ্টের নগ্নমূর্তি অঙ্কিত হয়েছে। এ ছাড়া ক্রুশবিদ্ধ যীশুখৃষ্টের লক্ষ লক্ষ নগ্নমূর্তি সারা খৃষ্টান জগতের শ্রদ্ধাভক্তি লাভ করেছে। মূর্তি নগ্ন হলেই নাসিকা কুঞ্চিত করার কোন কারন ঘটে না।

মুক্তকেশীঃ- কালী মায়াতীতা কিন্তু অনন্ত জীবকোটিকে মায়াপাশে বদ্ধ করেন। তার মুক্তকেশ জাল মায়াপাশের প্রতীক। আবার কালী ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিবেরও মুক্তিবিধান করেন বলে তিনি মুক্তকেশী। ক-অ-ঈশ= কেশ। ক ব্রহ্মা, অ বিষ্ণু এবং ঈশ শিব। কাজেই কেশ বলতে বুঝায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব। কেশকে মুক্ত করেন বলে দেবী মুক্তকেশী।

কালী যে ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং শিবকেও ভুক্তিমুক্তি প্রদান করেন নিরুত্তরতন্ত্রে তা স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে। বলা হয়েছে –অনিরুদ্ধসরস্বতী কালী মহাকল্পতরু। তিনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবেরও ভুক্তিমুক্তির কারণ–
মহাকল্পতরুঃ কালী অনিরুদ্ধসরস্বতী।
ব্রহ্মবিষ্ণুমহেশানাং ভুক্তিমুক্তোককারনম।।
—–নিরুত্তর তন্ত্র পঃ ২

আবার মুক্তকেশীর অন্যরকম ব্যাখ্যাও আছে –কেশবিন্যাসাদি বিলাস-বিকার। দেবী নির্বিকার। এইজন্যই তিনি বিগলিতচিকুরা বা মুক্তকেশী।

ললাটে অর্ধচন্দ্র — ত্রিনয়না

কোথাও কোথাও বর্ননা আছে কালীর ললাটে অর্ধচন্দ্র শোভা পাচ্ছে। এ সম্বন্ধে মহানির্বাণতন্ত্রে বলা হয়েছে নিত্যা কালরুপা অব্যয়া শিবস্বরূপা কালীর ললাটে অমৃতত্বহেতু চন্দ্রকলা অঙ্কিত —
নিত্যায়াঃ কালরূপায়া অব্যয়ায়াঃ শিবাত্মনঃ।
অমৃতত্বাল্ললাটেহস্যাঃ শশিচিহ্নং নিরূপিতম।।
——মহানির্বাণতন্ত্র ১৩/৭
চন্দ্রের থেকে অমৃত ক্ষরিত হয়। দেবীর ললাটে আছে চন্দ্রের সপ্তদশী কলা -অমাকলা। দেবী অমৃতত্ব অর্থাৎ নির্বাণমোক্ষ প্রদান করেন বলে তাঁর ললাটে অর্ধচন্দ্র বা চন্দ্রকলা।

ত্রিনয়না—– অতীত, বর্ত্তমান ও ভবিষ্যৎ সমস্তই সেই ত্রিগুণময়ী ত্রিকালদর্শিনী মায়ের নয়নপথে সর্বক্ষণ প্রতিভাত রয়েছে। ধ্যানান্তরে দেখতে পাওয়া যায় –‘বহ্ন্যর্কশশিনেত্রাঞ্চ রক্ত বিস্ফুরিতাননাং ‘মায়ের নয়নত্রয়ে বিশ্বের বহ্নি, সূর্য্য ও চন্দ্ররূপী তিনটি নয়ন সর্বক্ষণ উদ্ভাসিত রয়েছে। তা যথাক্রমে বিশ্বের তেজঃ বা দীপ্তিতে –প্রথম, জ্যোতিঃ বা প্রকাশে — দ্বিতীয় এবং শান্তি বা রূপে –তৃতীয় ভাব বিকাশ করছে। রক্তই জীবের শক্তিস্বরূপ, তাই তাঁর নয়নত্রয় শক্তি-সহযোগে রক্তবিস্ফুরিত হয়ে উদ্দীপ্ত রয়েছে।

সাধারণতঃ জীবের দুইটি নয়ন দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু তাতে কোনও বস্তুর দ্বিত্ব কখনই প্রতীত হয় না, দুই চক্ষে দেখলেও প্রত্যেক বস্তু সর্বদা একটিই দেখা যায়। ব্রহ্মের সৎ ও চিৎ অভিন্ন বস্তু হলেও, সাধকের বুঝবার সময় তা দুইটি ভিন্ন ভাবেই দেখতে বা বুঝতে হয়। কিন্তু বিশ্বের সর্বত্রই সৎ চিৎ অংশ একাধারে বিদ্যমান আছে। যে কোন একটি জঙ্গমরূপ–জীব বা একটি স্থাবর রূপ বৃক্ষই দেখ, তার বহিরাবরণ বা স্থুলরূপ সৎ-শক্তি-প্রধান, তা জড়েরই অনুরূপ, কিন্ত তার অন্তরে চিৎ-প্রধান যে অব্যক্ত প্রকাশশক্তি বিদ্যমান আছে, যার দ্বারা তার পুষ্টি ও বৃদ্ধিরূপে ক্রমান্বয়ে পত্র, পল্লব, পুষ্প ও ফলাদি প্রস্ফুটিত হচ্ছে, যার বলে তাকে চৈতন্যযুক্ত বুঝতে পারা যাচ্ছে এবং যার অভাবে সে যেন সময়ে মরেও যায়, সেই চৈতন্যসত্তার স্বত্নন্ত্র অস্তিত্ব কেউ তার জড়াঙ্গে পৃথকভাবে দেখতে পায় না বা তা দেখতে চেষ্টাও করে না।

‘জ্ঞান-প্রদীপে’ ‘রাজযোগের’ উপদেশ, ‘ব্রহ্ম-ধ্যান’-উপলক্ষে তাঁর (১) বিরাট (২) ঈশ্বর ও (৩) র্নিগুণ-ব্রহ্ম ধ্যানের বিষয় যা উক্ত হয়েছে তা অবশ্য সাধারণ সাধকের এক্ষনে ধারণাতীত। তবে সাধারণত বা তদনুগত জ্ঞানের ত্রিবিধ প্রাথমিক দৃষ্টি-পথেও স্থুল-দেহাভিমানী আত্মা (১) বিশ্ব, সূক্ষ্ম-দেহাভিমানী আত্মা (২) তৈজস এবং কারন-দেহাভিমানী আত্মা (৩) প্রাজ্ঞ এই ত্রিবিধ আত্মার পরিদর্শন-কল্পে যে নয়নের প্রয়োজন হয়, তাই সাধকের উপনয়ন, তৃতীয়-নয়ম বা জ্ঞানচক্ষু।
জীবের জ্ঞানাধার মস্তিষ্ক, তার সম্মুখাংশ, বুদ্ধি-বিচারের ক্ষেত্ররূপ–বিজ্ঞানময়-যন্ত্র। তারই মধ্যে অর্থাৎ ভ্রূ-দ্বয়ের পিছনে আজ্ঞাচক্রের ঠিক সম্মুখস্থিত কুটস্থ-বিন্দুই বিরাজিত রয়েছে। সেই বিন্দু-স্থলই উচ্চ সাধকের দিব্য-দৃষ্টির আধার উপনয়ন বা তৃতীয়-নয়ন।

দ্বিদল-বিশিষ্ট আজ্ঞা-চক্রস্থিত বাম দিকের চন্দ্রাধারদলের চন্দ্রাত্মক হং-বীজ থেকেই দেবীর বাম-নয়ন এবং সেই আজ্ঞাচক্রের দক্ষিন দিকস্থিত সূর্য্যাধার-দলের সূর্য্যাত্মক ক্ষং বীজ থেকেই দেবীর দক্ষিন-নয়ন এবং আজ্ঞাচক্র-কমলের কর্ণিকারূপ অগ্ন্যাধার-স্থিত অগ্ন্যাত্মক তৃতীয় লং বীজ থেকেই উক্ত তেজঃ, বা জ্ঞানাগ্নি-দিপ্ত দেবীর ‘তৃতীয়-নয়ন’ যথাক্রমে চন্দ্র,সূর্য্য ও অগ্নিরূপে তাঁর অব্যক্ত নয়নত্রয় উদ্ভাসিত হয়ে আছে।

“কালীকরাল-বদনা”— ‘কালী’ এই শব্দ উচ্চারণ করলে ‘কালই’ বা ‘কাল-ঈ’ বুজায়। অনাদি ও অনন্ত মহাকাল–ঈ অর্থাৎ ভূত,ভবিষ্যৎ ও বর্তমান-রূপী মহাকাল–ঈ = কালী বা মহাকালী অথবা দক্ষিনা আদি অষ্ট কালীরূপে সাধকের ধ্যেয়।
কালের কোলে সকলকেই লয় হতে হয়। ‘মহাকাল’ সৃষ্টি থেকে চিরকাল ধরে সমস্তই ‘কলন’ অর্থাৎ গ্রাস বা কালগ্রস্ত করছেন, সেই কারণে তিনি জগৎ-সংহারক ‘মহাকাল’ নামে কীর্ত্তিত। মহাপ্রলয় কালে সেই মহাকালকেও যিনি গ্রাস করেন বা নিজ অঙ্গে লয় করে নেন, তিনিই ‘করাল-বদনা কালী’।
বিশ্বের সেই শেষ দিনের মধ্যে বা সেই অন্তিম লয়-লীলার মধ্যেও যিনি কালকে সতত ‘ঈ’ অর্থাৎ ‘ঈক্ষণ’ অথবা দর্শন করছেন, তিনি কাল -ঈ = কালী।

মহাকালের অন্তর্গত খন্ডকালের মধ্যে সংসারের নিত্য সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় কার্য্য যা অহরহঃ অবিরত ভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তাও যিনি ‘ঈ’ বা ঈক্ষণ করছেন বা সেই অনাদি কাল থেকেই কাল-সংহারিণী কালীর করালবদনের মধ্যে নিত্য কত কি যে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে, সে সবও যিনি সতত ‘ঈ’ বা ঈক্ষণ অথবা দর্শন করছেন, তিনিই ‘কালী’।
জগতের নিত্য সৃষ্টি ও পুষ্টির ন্যায় সংহার কার্য্যও তাঁতে সম্পন্ন হচ্ছে, তাঁর করাল-বদনে তাই সতত প্রকটিত হচ্ছে।

সংসারের জীবসমুহের মুখই স্থুল ভাবে তাঁর করাল-বদনের মহিমা সর্বদা প্রকাশ করছে। উদ্ভিজ্জ, স্বেদজ, অণ্ডজ, ও জরায়ুজ রূপে একে অন্যের ভক্ষক হয়ে সংসারে সর্বদা তাঁর লয়-লীলা অক্ষুণ্ণ রেখেছে। আমরাও আজন্ম কত কি যে, আমাদের এই ক্ষুদ্রায়তন মুখমণ্ডল দিয়েই গ্রাস করছি, আমাদের দেহ-পরিমাণের তুলনায় তাঁর সমষ্টি যে কতগুণ, একবার ভেবে দেখলে তা বোঝা যায়।

‘করাল-বদন’ আবার তাঁর কঠোরতারও নিদর্শন। অসুরনাশিনী মায়ের মুখমন্ডলে সেই আদি দেবাসুরের যুদ্ধের স্বরূপ ঘোর সময়নিষ্ঠুরতাও প্রতিভাত হয়েছে।
পক্ষানন্তরে তিনি যে, তাঁর প্রিয়তম সাধক-সন্তানের অন্তরের অতি হেয় ও ভীষণ কামাদি রিপুরূপ আসুরীপ্রবৃত্তি বা আসুরী-সম্পদময় অসুর সমুহের সঙ্গে সর্তত সমর-রতা! কোন অতীত যুগে মা, দানব-দলনের জন্য আবির্ভূতা হয়েছিলেন,আজও সেই অসুরনাশিনী মায়ের মূর্ত্তি ভক্তের হৃদয়ে দেদীপ্যমানা।

তাঁর ধ্যান করতে গিয়ে একাগ্রচিত্ত হলেই, সাধক অন্তরের মধ্যে এক ভীষণ কোলাহলের অস্তিত্ব অনুভব করে থাকে। সে কালাহলের কারণ অনুসন্ধান করলে, পরক্ষণেই মুমুক্ষ-সাধক জানতে পারে যে, দেবাসুর সময়ের সে যুগ-যুগান্তরের ব্যবধান আজ যেন বিলীন হয়েছে। দেবতা ও দানব উভয়ই যে মায়েরই সন্তান! তবে শান্ত-প্রকৃতি দেবতাগণ ও সজ্জন সাধুদের রক্ষার জন্য অসুরদের তখন সাময়িকভাবে যেন ভীষণ তাড়না বা বিনাশ-প্রায় করেছিলেন, কিন্তু তারা ত মরে নি। তারা যে আবার মাতৃশক্তি-পুষ্ট বা দৈবীশক্তি-সম্পন্ন অসুর-গুরুর মৃতসঞ্জীবনী মন্ত্রবলে পুনঃ জীবিত হয়ে যেন মৃতকল্পভাবে রিপুরূপে অভিনব দানবদেহ গ্রহণ পুর্বক মানব-ইন্দ্রিয়ের পঞ্চ-ভূতাত্মক হয়ে রয়েছে।

মানব যে, দেবতা ও দানব উভয় আত্মারই প্রতীক-স্বরূপ। মানবের ভিতরে নিয়তই যে, সেই দেবাসুরের ভীষণ সমর বিরাজিত রয়েছে। ভক্তবৎসলা মা, সেই কারণ প্রিয় ভক্তগণকে শ্রীশ্রীচন্ডীর একাদশ অধ্যায়ে আশ্বাসবাণী দিয়েছন, —
“ইথং যদা যদা বাধা দানবোথা ভবিষ্যতি।
তদাতদাবতীর্য্যাহং করিষ্যাম্যরিসংক্ষয়ম।।” — ১১/৫৪

ভক্তের হৃদয়ে সেই দানবী-কোলাহল অনুভূত হলেই তিনি অবিলম্বে সেখানে অবতীর্ণা হবেন। অসুর-বিনাশিনী মা অসুর-দলনের জন্যই যেন সতত করাল-বদনা, কিন্তু ভক্তের প্রতি তিনি যে, সদাই করুণাময়ী। সেই কারন তাঁর ‘ধ্যান ‘ মন্ত্রের মধ্যে তিনি আবার ‘হসম্মুখীং’ অর্থাৎ হাস্যমুখী এবং সুখপ্রসন্নবদনাং, স্মেরাননসরোরুহাং অর্থাৎ তিনি প্রসন্নমুখী ও হাস্যযুক্তাও বটে। তিনি একাধারে কঠোর হয়েও করুণাময়ী, প্রসন্নবদনা, স্মেরাননা! এই একীভূত কঠোর-কোমলতাই তাঁর অপূর্ব স্বরূপ। তাই চন্ডীর ৪র্থ-অধ্যায়ের ২২-নং শ্লোকে স্পষ্টই উক্ত হয়েছে :–
চিত্যেকৃপা সমরনিষ্ঠুরতাশ্চ দৃষ্টা।
ত্বয্যেব দেবী বরদে ভূবনত্রয়োহপি।।
অর্থাৎ “হে দেবি! তোমার চিত্তে অনির্ব্বচনীয় কোমলতাপূর্ণ কৃপাও বাইরের সমরনিষ্ঠুরতার ভীষণ প্রচন্ডভাব, এই অপুর্ব স্বরূপ একাধারে কেবল তোমাতেই পরিলক্ষিত হয়। তুমি ত্রিভুবনের বরপ্রদায়িনী।”

মায়ের মুখমন্ডল যেন অনিচ্ছায় কেবল কঠোর কর্তব্য-কর্মের প্রভাবস্বরূপ অসুর-বিনাশ-কার্য্যে প্রদীপ্ত হয়েছে, কিন্ত তাঁর অন্তরের অতীব স্নেহপূর্ণ বিচিত্র বাৎসল্য-ভাবও সেই সঙ্গে ফুটে উঠেছে। পুত্রের প্রতি মায়ের শাসন যে, এইরূপ স্নেহ-তিরস্কারপূর্ণ!

পুর্বেই বলা হয়েছে “সাধকই প্রকৃতি -মাতার প্রকৃতরূপ বা ভক্তই ভগবানের যথার্থ স্বরূপ, পক্ষান্তরে ভগবানই যেন ভক্তের প্রত্যক্ষ ভাব-স্বরূপ, “সেই কারন সময়ে দুইই যে এক, অভেদ-ভাবাপন্ন অদ্বৈত বস্তু। উপাস্য-উপাসক ভাব-সমতায় তার অতি মধুর মিলন-সম্ভুত উপাসকভাবই উপাস্য মুর্ত্তিতে যেন প্রস্ফুটিত হয়ে থাকে। তাই মায়ের মুখ-কমল কেমন অদ্ভুত যোগমুক্ত বা কি এক অব্যক্ত ভাবপূর্ণ। সাধক, তন্ময় বা তাঁতে যোগযুক্ত হলেই সে ভাব অন্তরে স্পষ্ট অনুভব করতে পারবে, অন্যথায় তা বোঝান যাবে না।

কালীর দন্তশ্রেণীঃ- দেবীর করালবদনের ঘোর দন্তশ্রেণী তাঁর অবিশ্রান্ত লয় ক্রীয়ারই নিদর্শন। ধ্যানান্তরে দেখতে পাওয়া যায় “দেবীং লোলজিহ্বাং দিগম্বরীং।” দন্তসমুহ দ্বারা আবার তাঁর উক্ত লোলজিহ্বা সদা নিপীড়িত হচ্ছে। জিহ্বার অন্য নাম ‘রসনা’, ‘রসনাই সকল রস গ্রহনের মুখ্য যন্ত্র। জীবের রসনাই যেন সর্ব-রসের জ্ঞানরূপ -বিন্দুটি চ্যুত হয়ে বাসনা বা কামনাস্বরূপে কার্য্য করে। রসনা ও উপস্থ দুটিই জীবের ভীষণ ইন্দ্রিয়। এই দুটি ইন্দ্রিয় প্রত্যেকেই দুটি দুটি করে কার্য্য করে। জিহ্বা যেমন কূর্চ্চরসের-আস্বাদ সুখ ভোগ করবার যন্ত্র, তেমনি বাক্য বা কথা বলবার পক্ষেও জিহ্বা অপরিহার্য বস্তু। উপস্থ’ও সেইরূপ স্ত্রী-পুরুষের উভয়েরই সম্ভোগ ক্রিয়ার রস বা সুখভোগরূপ ‘বিন্দুত্যাগ’ ও ‘বিন্দুগ্রহণাত্মক’ সৃষ্টি-যন্ত্র। এখানে ‘বিন্দু’ অর্থে বীর্য্য বা জীবের চৈতন্য-বিন্দু।

পক্ষান্তরে মুত্রাদি ক্রিয়াও এই যন্ত্র-সাহায্যে সাধিত হয়। সুতরাং এই দুটি ইন্দ্রিয়ই জীবের কাম-রস বা বাসনা অথবা ভোগ লালসার যন্ত্র। অষ্টাঙ্গ যোগ সাধনার প্রথম ক্রিয়ার অভ্যাস, এই দুটি যন্ত্রের উপর দিয়েই সাধককে করতে হয়। এটাই যম বা সংযম ক্রীয়া। স্থুলদেহের সার বস্তু ‘বিন্দু বা বীর্য্যের’ ধারণ বা ‘বীর্য্য রক্ষা’ এবং সুক্ষ্ণদেহের প্রথম স্তর প্রাণ-শরীরের সার ধন ‘বাক্য-সংযম’ ও পক্ষান্তরে ভোজন-সংযম’ও এর অন্তর্গত বলতে হবে। মন-সংযম এটারই অন্তনির্হিত অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম ক্রিয়া, তা প্রাণায়াম ও প্রত্যাহার আদি যোগের অন্যান্য অঙ্গ বা ক্রিয়ার অন্তর্গত। মা, সেই লোলজিহ্বা নিপীড়ন দ্বারাই সাধককে তার সর্ববিধ লালসা-সংযমেরই ইঙ্গিত করেছেন।

‘রসনা’ সততই রক্তাভ লালবর্ণ বিশিষ্ট। ঘোর রক্তবর্ণই যথার্থ রজোবর্ণ, কিন্তু রসনার বর্ণ ঘোর লাল নয়, ঈষৎ গোলাপি অর্থাৎ লালের সঙ্গে সামান্য শ্বেতাভাযুক্তা। এই লাল বর্ণই পূর্ব কথিত রজোগুণের বর্ণ এবং শ্বেতবর্ণ সত্ত্বগুণের বর্ণ। সুতরাং রজোপ্রধান ঈষৎ সত্ত্বমিশ্রিত ভাবই রসনা। রজোগুণের কার্য্যই ক্রিয়া এবং সত্ত্বগুণের কার্য্যই সুখ। অতএব সুখাত্মকক্রিয়া বা কার্য্যের আধার রসনা বা বাসনা জিহ্বা নামে অভিহিত। এটাই জীবের সংসার-বন্ধনের কার্য্য। এটাকেই শ্বেতাভ শুদ্ধ বা অচঞ্চল ও অপেক্ষাকৃত স্থায়ী সত্ত্বগুণের দ্বারা দমন করবার আদর্শপ্রদান ছলে তাঁর শুভ্রোজ্জ্বল কঠিন দন্তশ্রেণীর দ্বারা রসনা বা জিহ্বার নিপীড়ন। রজোগুণ সাধারণতঃ সত্ত্বগুণের দ্বারাই বশীভূত হয়। সাধক সংযম-সাধনা যোগেই তা সম্পন্ন করতে পারে।

ব্যক্ত ষটচক্রের অতীত যে, গুপ্ত আরও তিনটি চক্র আছে। তার প্রথমটি ললনা-চক্র বলে কথিত। এত ললনাচক্রের স্থান সেই মেরুদণ্ডান্তর্গত সুষুন্মা মধ্যেই, তা জীবের কণ্ঠের উপরিস্থিত এবং তালুমুলের সমীপবর্তী ‘ঘণ্টিকা’ বা আলজিহ্বার ঠিক সমসুত্রপাতে অবস্থিত। তা চতুঃষষ্টিদল (কোন শাস্ত্রমতে আবার দ্বাদশদল) যুক্ত বিচিত্র কমল। এতেই অমৃত-স্থালী আছে। এটা থেকেই জীবের রসনায় সর্ববিধ রসগ্রাহীতার গূঢ় শক্তি সঞ্চারিত হয়ে থাকে। উন্নতকোটির সাধক এই চক্রের গুপ্ত সাধনায় সিদ্ধ হতে পারলেই মায়ের দন্তনিপীড়িত লোল বা লোলজিহ্বার গভীরতম তত্ত্ব অনুভব করে ধন্য হন।

অসুরদের বুদ্ধি, রক্ত ঝরছে -রজোগুণ বেরিয়ে যাচ্ছে, আর সত্ত্বগুণের দ্বারা তাদের অসুরভাব নির্জিত করে তাদের বুদ্ধিকে দৈবী সম্পদে পরিণত করে মা মালা করে পরে আছেন।
অথবা যোগবাশিষ্টের নির্বাণ প্রকরণ এবং কর্পূরাদিস্তুতির টিকাকাররা বলেন, আগামী সৃষ্টির জন্য পূর্ব-সৃষ্টির সংস্কার মুলমায়াকে মালা করা হয়েছে।

আবার তন্ত্র বলছেন, “পঞ্চাশৎ বর্ণমুন্ডালী”। শব্দ ছাড়া অর্থের অভিব্যক্তি হয় না। শব্দের সার স্বর ও ব্যঞ্জন। স্থুল অর্থ বা প্রত্যয় যখন নাশ হয়, তখন সূক্ষ্ণ স্বর ব্যঞ্জন সংস্কার প্রভৃতিকে আশ্রয় করে থাকে। আর মুক্তামালা হলো তাঁর কোটি কোটি বিভুতিশক্তি।

পদ্মপূরাণে আছে, ত্রিপুরাসুন্দরী অর্জুনকে দেখালেন, এক-একটি মুক্তদানায় এক-একটি অভুতপূর্ব ব্রহ্মাণ্ড, যা আমাদের ব্রহ্মার জ্ঞানের বাইরে। আমরা ভাবি, দৃশ্য-জগৎ ছাড়া বুঝি আর কোন জগৎ থাকতে পারে না। শ্রীকৃষ্ণ, অর্জুনকে দেখালেন, কালী কল্পতরুতে থলো থলো কৃষ্ণ ফলে রয়েছে।

তথ্য: কালীকথা
ছবি: Sayani S Mondal

error: Content is protected !!