জগদ্ধাত্রী পুজোয় ইতিহাসের কথা

একতারা বাংলা, নিউজ ডেস্কঃ

মায়াতন্ত্র-এ আছে, ‘প্রপূজয়েজগদ্ধাত্রীং কার্তিকে শুক্লপক্ষকে দিনোদয়ে চ মধ্যাহ্নে সায়াহ্নে নবমেহহন।’ অর্থাৎ কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে দিনের শুরুতে মধ্যাহ্নে এবং সায়াহ্নে জগদ্ধাত্রী পুজো করা যায়। কিন্তু বাংলায় এই পুজোর প্রচলন নিয়ে ইতিহাস কি বলছে?

ইতিহাস বলছে, ১৭৫৪ সাল, বিপুল অঙ্কের কর জমা দিতে না পারায় পুজোর মুখেই কৃষ্ণচন্দ্রকে বন্দি করেছিলেন তত্কালীন বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাব আলিবর্দী থান। বন্ধু-বান্ধব ও ইংরেজ সরকারের সহায়তায় সেই সময়কার মুদ্রায় ৯ লক্ষ টাকা দিয়ে অবশেষে দুর্গাপুজোর দশমীর দিন ছাড়া পান তিনি।

অর্থাৎ নবাবের কারাগার থেকে অবশেষে তিনি যখন মুক্ত হয়েছিলেন তখন দুর্গোৎসব প্রায় শেষ। নৌকায় কৃষ্ণনগর ফেরার পথে রাজা বুঝলেন, সে দিন বিজয়া দশমী। সে বার পুজোয় উপস্থিত থাকতে না পারায় বিষণ্ণ রাজা নৌকার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
জনশ্রুতি সেখানেই কৃষ্ণচন্দ্র স্বপ্নে দেখেছিলেন যে এক রক্তবর্ণা চতুর্ভুজা কুমারী দেবী আগামী কার্তিক মাসের শুক্লানবমী তিথিতে তাঁর পুজো করতে তাঁকে বলছেন।

অন্য মতে, ইংরেজদের বন্ধু এই সন্দেহে ১৭৬৪ সালে মীরকাশিম মুঙ্গেরের কারাগারে বন্দি করেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র ও তাঁর পুত্র শিবচন্দ্রকে। এও শোনা যায়, মীরকাশিম নাকি কৃষ্ণচন্দ্রের প্রাণদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন। কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর দূত মারফত এই সংবাদ মেরতলার প্রসিদ্ধ তান্ত্রিক কালীশঙ্কর মৈত্রের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন এবং তাঁর প্রাণ রক্ষার প্রার্থনা জানিয়েছিলেন।

কারাগারেই কৃষ্ণচন্দ্র এক কুমারী দেবীর স্বপ্নাদেশ লাভ করেন। কারাগার থেকে মুক্তিলাভের প্রতিশ্রুতিও লাভ করেছিলেন। জনশ্রুতি, কিছু দিনের মধ্যেই তিনি সত্যি কারামুক্ত হয়েছিলেন।

এর পরেই কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র শিবচন্দ্র ও গোপালভাঁড়কে নিয়ে উপস্থিত হন মেরতলার প্রসিদ্ধ তান্ত্রিক কালীশঙ্কর মৈত্রের কাছে। কৃষ্ণচন্দ্র এই স্বপ্নের কথা জানান এবং জানতে চান কে এই দেবী?

কালীশঙ্কর তাঁকে জানান, দেবী স্বয়ং চণ্ডী। প্রাচীন কালে এই দেবীর পুজোর প্রচলন ছিল। রাজা জানালেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তিনি এই দেবীর পুজোর আয়োজন করতে চান। এর উত্তরে কালীশঙ্কর জানান, কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে দেবীর পুজোর বিধান আছে।

এক সময় কৃষ্ণচন্দ্রের হাতে করে পুজো করা পাথরের জগদ্ধাত্রী, দুর্গা, পাঁচ মাথা বিশিষ্ট তথা পঞ্চানন শিবের মূর্তি ও শিবলিঙ্গ ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হলেও কৃষ্ণনগর পূর্ব পাকিস্তানে চলে যায়। এই সব বিগ্রহও চলে যায় পাকিস্তানে। এই সময় রানি জ্যোতির্ময়ী দেবী পদক্ষেপ নেন। কৃষ্ণনগরকে ফের দেশের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ভাঙা মূর্তিটিও ফেরত পায় নদিয়ার রাজপরিবার।

এবার করোনার আবহে উত্সবের জাঁকজমক অনেকটাই ফিকে হয়েছে। কলকাতার পাশাপাশি বিভিন্ন জেলাতেও জগদ্ধাত্রী পুজো চলছে। প্রথা মেনে কুমারী পুজো, পুষ্পাঞ্জলী সবই হচ্ছে নিয়মমাফিক।

error: Content is protected !!