পৌষ পার্বণ কলমে: কুহেলী বিশ্বাস

পরিচয় – কুহেলী বিশ্বাস একজন শিক্ষিকা। নৈতিক শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত বই “বাণী বিচিত্রা”। বেলডাঙ্গা, মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা তিনি।
     কথায় আছে, বাঙালিদের "বারো মাসে তেরো পার্বণ"। কিন্তু বাস্তবিকপক্ষে তার থেকেও বেশি উৎসব তথা পার্বণে আমরা মেতে থাকি।এর মধ্যে একটি হল এই পৌষ পার্বণ বা মকর সংক্রান্তি।প্রতি বছর ১৪ জানুয়ারি পালিত হয় মকর সংক্রান্তি। বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এদিন পৌষ মাস শেষ হয়ে মাঘ মাস শুরু হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই দিনটা অত্যন্ত পবিত্র ও তাত্‍পর্যপূর্ণ। এদিন থেকেই নতুন ফসল রোপণের মরশুম শুরু হয়। তাই আমাদের এই কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতির দেশে মকর সংক্রান্তি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।

মকর সংক্রান্তিতে সূর্যের উদ্দেশ্যে আরাধনা করা হয়। হিন্দ্যু ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, এই দিনটা বিশেষ সৌরদিন হিসেবে চিহ্নিত। 'মকরসংক্রান্তি' শব্দটি দিয়ে নিজ কক্ষপথ থেকে সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশকে বোঝানো হয়ে থাকে। ভারতীয় জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী 'সংক্রান্তি' একটি সংস্কৃত শব্দ, এর দ্বারা সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করাকে বোঝানো হয়ে থাকে।

প্রাচীনকাল থেকেই এই উৎসব চলে আসছে। তবে সুস্পষ্টভাবে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। হতে পারে এটা হাজার বছরের উৎসব বা তারও আগের তবে পুরাণেও এর উল্লেখ আছে। যার মধ্যে আমরা উত্তর পেয়ে যাই। পুরাণ অনুযায়ী, মকর সংক্রান্তির এই মহাতিথিতেই মহাভারতের পিতামহ ভীস্ম শরশয্যায় ইচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করেছিলেন। আবার অন্য মত অনুযায়ী, এই দিনই দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের যুদ্ধ শেষ হয়েছিল।বিষ্ণুদেব অসুরদের বধ করে তাঁদের কাটা মুন্ডু মন্দিরা পর্বতে পুঁতে দিয়েছিলেন, তাই মকরসংক্রান্তির দিনই সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাস হয়ে শুভ শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে আজও মানা হয়ে থাকে। আবার অন্য মতে, সূর্য এ দিন নিজের ছেলে মকর রাশির অধিপতি শনির বাড়ি এক মাসের জন্য ঘুরতে গিয়েছিলেন। তাই এই দিনটিকে বাবা ছেলের সম্পর্কের একটি বিশেষ দিন হিসাবেও ধরা হয়।

জড় বিজ্ঞান অনুযায়ী, সূর্যের গতি দুই প্রকার, উত্তরায়ণ এবং দক্ষিণায়ণ।
বিষূবরেখা থেকে ২২শে ডিসেম্বর সূর্য উত্তরায়ন থেকে দক্ষিণায়নে প্রবেশ করে। এ দিন রাত সবথেকে বড়(১৪ ঘণ্টা) হয় আর দিন সবথেকে ছোট(১০ ঘণ্টা) হয়। এর পর থেকে দিন বড় আর রাত ছোট হতে শুরু করে। মাঘ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত ছয় মাস উত্তরায়ণ। আবার শ্রাবণ থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত ছয় মাস দক্ষিণায়ণ। পৌষ মাসের সংক্রান্তিকেই বলা হয় উত্তর সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি। শাস্ত্র মতে উত্তরায়ণে মৃত্যু হলে মুক্তি প্রাপ্তি হয় এবং দক্ষিণায়ণে মৃত্যু হলে এর পুনরাবৃত্তি ঘটে অর্থাৎ তাঁকে আবার সংসারে ফিরে আসতে হয়। সূর্য এ দিনই ধনু রাশি থেকে মকর রাশিতে প্রবেশ করে। এর থেকেই মকর সংক্রান্তির উৎপত্তি।

                প্রাচীন কাল থেকেই দেবতার পূজায় পিঠের অর্ঘ্য প্রদানের রীতি রয়েছে। মধ্যযুগে ধর্মপূজায় মদ্যমাংসের সঙ্গে পিঠে নৈবেদ্যও দেওয়া হত। তবে দেবতার পূজায় নিবেদনের জন্য বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকার পিঠে প্রস্তুত করার বিধান রয়েছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত পিঠেপর্বের মধ্যে পৌষ সংক্রান্তির পৌষপার্বণই সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ। প্রাচীন হিন্দুরা এই দিনটিতে পিতৃপুরুষ অথবা বাস্তুদেবতার উদ্দেশ্যে তিল কিংবা খেজুড় গুড় দিয়ে তৈরি তিলুয়া এবং নতুন ধান থেকে উৎপন্ন চাল থেকে তৈরি পিঠের অর্ঘ্য প্রদান করতেন। এই কারণে পৌষ সংক্রান্তির অপর নাম তিলুয়া সংক্রান্তি বা পিঠে সংক্রান্তি।

পশ্চিমবঙ্গে পৌষ পার্বণ:
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মকর সংক্রান্তি বা পৌষসংক্রান্তি-তে মূলত নতুন ফসলের উৎসব ‘পৌষ পার্বণ’ উদযাপিত হয়। নতুন ধান, খেজুরের গুড় এবং পাটালি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরি করা হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় চালের গুঁড়া, নারিকেল, দুধ আর খেজুরের গুড়।এই দিনে সারাবাড়ি জুড়ে বিভিন্ন ধরনের আল্পনা দেওয়ার রীতি আছে।তেমন,গরুর গোয়ালে গরুর খুর ,গরুর গাড়ি ইত্যাদি। তাছাড়া,ধানের গোলা এঁকে তাতে তেল সিঁদুর দিয়ে নতুন ধান দিতে হয়। পরদিন সূর্য ওঠার আগেই আঁকা ধানের গোলা থেকে ধান,খড় ইত্যাদি তুলে ফেলতে হয়।

আবার কোন কোন জায়গায়

আউনি বাউনি বা আগলওয়া পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে পালিত একটি শস্যোৎসব। এই উৎসব ক্ষেতের পাকা ধান প্রথম ঘরে তোলা উপলক্ষ্যে কৃষক পরিবারে পালনীয় অনুষ্ঠানবিশেষ। আমন ধান ঘরে প্রথম তোলার প্রতীক হিসেবে কয়েকটি পাকা ধানের শিষ ঘরে এনে কিছু নির্দিষ্ট আচার অনুষ্ঠান পালন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে পৌষ সংক্রান্তির দিন দু-তিনটি ধানের শিষ বিনুনি করে ‘আউনি বাউনি’ তৈরি করা হয়। শিষের অভাবে দু-তিনটি খড় একত্রে লম্বা করে পাকিয়ে তার সঙ্গে ধানের শিষ, মুলোর ফুল, সরষে-ফুল, আমপাতা ইত্যাদি গেঁথে ‘আউনি বাউনি’ তৈরি করারও রেওয়াজ রয়েছে। এই আউনি বাউনি ধানের গোলা, ঢেঁকি, বাক্স-পেটরা-তোরঙ্গ ইত্যাদির উপর এবং খড়ের চালে গুঁজে দেওয়া হয়। বছরের প্রথম ফসলকে অতিপবিত্র ও সৌভাগ্যদায়ক মনে করে একটি পবিত্র ঘটে সারা বছর ধরে সংরক্ষণ করা হয়। এই আচারটিকেই ‘আউনি বাউনি’ বলা হয়।


মকরসংক্রান্তি নতুন ফসলের উৎসব ছাড়াও ভারতীয় সংস্কৃতিতে ‘উত্তরায়ণের সূচনা’ হিসেবে পরিচিত। একে অশুভ সময়ের শেষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, পঞ্জিকা মতে, জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়। এই দিনে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত সাগরদ্বীপে মকর সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে কপিল মুনির আশ্রমকে কেন্দ্র করে পুণ্যস্নান ও বিরাট মেলা অনুষ্ঠিত হয়। সহস্রাধিক পুণ্যার্থী ও অন্যান্য রাজ্য থেকে আগত দর্শনার্থীদের সমাগম হয় এই মেলায়। অজয় নদীর তীরে হয় জয়দেবের মেলা। এখানে বাউল গান শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় গোটা পৌষ মাস জুড়ে পূজা ও মেলার আয়োজন করা হয় এবং এই পৌষ পার্বণের পর সমাপ্তি হয়।

error: Content is protected !!