রবীন্দ্রজয়ন্তীঃ শান্তিনিকেতন আশ্রম ও রবীন্দ্রনাথ

রাধামাধব মণ্ডল :

তিনি আমার একাকিত্ত্বের সঙ্গী। বিষণ্ণ বিকেলের শেষ হয়ে আসা আলোয় তিনিই উজ্জ্বল। তিনি রবীন্দ্রনাথ। আমার দেখা আকাশের সীমানা ছাড়িয়ে মস্ত আকাশের যে আলো, সে আলো রবীন্দ্রনাথ। আলোর রবীন্দ্রনাথ আজও আমাকে ঘুমাতে দেয় না। সারারাত, সারাবেলা তিনিই জাগিয়ে রাখেন। একা একা তাঁকে উপলব্ধি করি আজীবন। আমার জীবনযাপনের সঙ্গী, পথের দিশা রবীন্দ্রনাথ।
সেই রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি শান্তিনিকেতন আশ্রম বিদ্যালয়। আধুনিক শান্তিনিকেতনের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া, জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট গ্রাম গুলির অস্তিত্ব আজ আর নেই। তবে এখনও ভুবনডাঙা, সুরুল, শ্যামবাটি, বল্লভপুর, শ্রীনিকেতন, তালতোড়ের মধ্যেই রয়েছে, সে দিনের গ্রাম গুলির যাবতীয় ইতিহাস!

বোলপুরের পরিচিতি লাভের অনেক আগে থেকেই, সে যুগের নদী পথের বাণিজ্যে প্রভাব বিস্তার করেছিল বোলপুরের আশপাশের অঞ্চল। অঞ্চলের রায়পুর, সুরুল, সুপুর, চন্দনপুর, মির্জাপুর ও তালতোড় গ্রাম গুলি ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ক্রমশ পরিচয় পেতে থাকে। সে সময় বর্মীদের আক্রমণে আতঙ্কিত হয়ে, মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা থেকে লালচাঁদ সিংহ বীরভূমের আমদপুর মৌজায় চলে এসেছিলেন বলে জানা যায়। সেই সঙ্গে এনেছিলেন অসহায় অবস্থার মধ্যে পরা এক হাজারের মতো তাঁতিদের পরিবারকে।

তারা পরবর্তী কালে বীরভূমের তাঁতিপাড়া, কড়িধ্যা, রায়পুর, সুপুর, মির্জাপুর ও বোলপুরের বিভিন্ন গ্রামে বসতি শুরু করে। এদিকে সে সময় লালচাঁদের পুত্র শ্যামকিশোর কোম্পানির অধীনে কাজ করে হঠাৎ বিত্তবান হয়েছিলেন। এবং তাঁর কেনা সম্পত্তিতেই শান্তিনিকেতনের অদূরে শ্যামবাটি মৌজা ১৯২৫ এর জরিপে চিহ্নিত হয়েছিল। অপরদিকে শ্যামবাটির দক্ষিণে ছিল মকিশোরের জ্যেষ্ঠ পুত্র ভুবনমোহনের ভুবনডাঙ্গা। সে সময় ভুবনডাঙার জঙ্গলে লুকিয়ে লুকিয়ে আলাপ জমাতে, মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল অতিপ্রাচীন দুটি ছাতিম গাছ।

সেই ছাতিম গাছের কাছাকাছি একখানি দ্বিতল গৃহ নির্মাণ করেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি সে সময় আশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য আউশগ্রামের ডাঙায় জমি না পেয়ে, ভুবনডাঙার এই মাঠটিকেই নির্বাচন করেন। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ভুবনমোহনের পুত্র প্রতাপ নারায়ণের নিকট দ্বিতল গৃহ সমেত বিশ বিঘা জমি পাঁচ হাজার টাকায় কিনে, শান্তিনিকেতন আশ্রমের কাজকর্ম শুরু করেন।
রায়পুরের জমিদার লর্ড এস পি সিংহ, দেবেন্দ্র রবীন্দ্রের সম্পর্ক, সে দিনের “শনিবারের চিঠি” র বিতর্কিত সম্পাদক রজনীকান্ত দাস, বনভিলার ঐতিহাসিক গুরুত্ব, লোচনদাস প্রমুখের স্মৃতি ধন্য প্রাচীন ইতিহাসের এলাকা এই রায়পুর। রজনীকান্ত দাসের (১৯০০-১৯৬২ খ্রিঃ) পৈতৃক ভিটা রায়পুরেই। রায়পুরের ১ নম্বর লাটের রানিমা সুহাসিনী দেবী বিংশ শতকে সুরেশ্বর শিবমন্দির নির্মাণ করে দিয়ে ছিলেন।

ইংরেজি ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানির রেল চলতে শুরু করলে, বোলপুরের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ তৈরি হয়। সে সময়ই বোলপুরে একটি স্টেশন হয়। সেই থেকেই রেলব্রিজ হওয়ার কারণে অজয়ের উপর নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৫১ তে পৌরসভা গঠনের এক বছরের মধ্যে বোলপুরের জনসংখ্যা হয় ১৬,৪১৩ জন।

১৮৯১ সালে শান্তিনিকেতন আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হলে, বোলপুরের গুরুত্ব বাড়ে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ১৮৮৮ খ্রীস্টাব্দের ২৬ ফাল্গুন, দ্বিজেন্দ্রনাথের পুত্র দ্বিপেন্দ্রনাথের নামে আশ্রমের ট্রাস্ট ডিড করেন। ১৮৯১ খ্রীস্টাব্দের ২২ শে ডিসেম্বর শান্তিনিকেতনে ব্রাহ্ম উপাসনা মন্দিরের প্রতিষ্ঠা হয়।

বিশ্বভারতীর ‘সিংহসদন’ রায়পুরের ভূস্বামী পরিবারের হাতে তৈরি। রবীন্দ্র সুহৃদ সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন সিংহই সে সময় দশ হাজার টাকা খরচ করে, পাঠভবনের সামনে বন্ধুত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন শান্তিনিকেতনে “সিংহসদন” নির্মাণ করে। জানা যায় ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে নরওয়ে যাত্রার সফরসঙ্গী ছিলেন। পরে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ৫ ই মার্চ সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন ইহলোক ত্যাগ করেছিলেন পুত্র সুশীল সিংহের বহরমপুর বাংলোতে।

সে সময় মহর্ষির প্রভাবে রায়পুরের জমিদার বংশের কেউ কেউ ব্রাহ্ম আদর্শ গ্রহণ করেন। শ্যামকিশোরের মধ্যম পুত্র ছিলেন মনমোহন। মনমোহনের পুত্র ছিলেন স্মৃতিকণ্ঠ এবং শ্রীকণ্ঠ সিংহ। বিভিন্ন গবেষকের লেখা থেকে মেলে, শ্রীকণ্ঠ সিংহ ও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম সভায় ধর্মালোচনা কালে ভাবে উচ্চকিত হয়ে পরে হাত ধরাধরি করে নৃত্য করতেন। শ্রীকণ্ঠ সিংহ সুকণ্ঠেরও অধিকারী ছিলেন। তিনি নৃত্য করতে করতে গানও করতেন।

১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে ক্যাপটেন শেরুইলের রিপোর্টে পাওয়া যায়, সে দিনের বোলপুর গ্রামে ১৬৩ টি কাঁচা কুঁড়ে ঘর ছিল, ছিল ১২৯ টি গরু, ৯৬ টির মতো বলদ এবং ৪৭ টি লাঙ্গল। বোলপুরের সে সময়ের গয়লাপাড়ার গোপগণ, শুঁড়িপাড়ার শুঁড়িরা চাষের প্রয়োজনে বলদ ও লাঙ্গল রেখেছিলেন।

বোলপুর ইলামবাজারের পথে চৌপাহাড়ি জঙ্গলে প্রবেশের আগেই রায়পুরের লর্ড পরিবারের রবীন্দ্রনাথ সিংহের বানানো বাগানবাড়ি ‘বনভিলা’। রবীন্দ্রনাথ এবং দ্বিজেন্দ্রনাথ বহু সময় পরিবারের লোকজন নিয়ে এসে বনভিলায় কাটিয়েছেন। এমনকি বনভিলায় আসার পথেই রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রামে শুনেছিলেন ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই নভেম্বর সে বছরের “নোবেল” পাওয়ার প্রথম সংবাদ।

বোলপুরের আদি যুগে, যে কয়েকটি উঠতি পরিবার, জীবিকার সন্ধানে এসেছিলেন তাদের মধ্যে সুপুরের দে, পাল, বহড়া এবং দাস পরিবার। সর্পলহনার দে ও দত্ত, চন্দ্র, রায়পুর মির্জাপুরের দালাল পরিবার, পুরন্দরপুরের দত্ত, কামারপাড়া থেকে দাস পরিবার আর হুগলি জেলার আরামবাগের বেলুন থেকে রায় বংশের আদিপুরুষ এসেছিলেন বোলপুরে।

আজকের শ্রীনিকেতন, অতীতের সুরুলের সেই অংশে থাকতেন কোম্পানির প্রথম রেসিডেণ্ট জন চিফ। বোলপুর স্টেশন থেকে সুরুল পর্যন্ত একটি ছোট রেললাইন চালু ছিল, তাতে চিফের সুবিধার জন্য গাড়িও চলতো। এই চিফের মাধ্যমে বাণিজ্য করে, ‘গড়ার থান’। ধীরে ধীরে ছোট কাপড়, লাক্ষা ও নীলের ব্যবসায় ধনী হয়ে ওঠে সুরুলের সরকার বাড়ির জমিদাররা। ১৯২৩ খ্রিঃ গান্ধিজী এসেছিলেন শান্তিনিকেতনে। এবং সে সময় তিনি সুরুলের জমিদার বাড়ির অশ্বিনী সরকারের কিছু জমির বন্দোবস্ত নিয়ে আলোচনা করেন। গান্ধিজীর কথায় তাঁরা বল্লভপুর ডাঙায় ‘আমারকুটিরে’র জায়গাটি দান করেন। ১৯৩৮ এর ৮ ডিসেম্বর, সুষেণ মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এসেছিলেন, শান্তিনিকেতনের আমার কুটিরের বিপ্লবীদের গোপন ডেরা দেখতে। ১৯২৮ খ্রিঃ ব্রিটিশ সরকার ‘আমার কুটির’ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

সুরুলের সরকার বাড়ির সঙ্গে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পর্ক ছিল। পরবর্তী কালে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গেও নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়, বিশ্বভারতীকে কেন্দ্র করে। সুরুলের জমিদার সরকার বাড়ির শ্রীনিবাস সরকার, শ্রীনিকেতনের নীলকুঠির কর্মচারী ছিলেন। সেই সূত্রে শ্রীনিবাস সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় জন চিফের। তাঁর দৌলতেই বৃদ্ধি পেয়েছে জমিদারির রূপ। তিনি সরকারদের বিখ্যাত দুর্গামন্দিরটি করেন এবং জমিদারির সম্পত্তি বৃদ্ধি করেন। দুর্গা দালান সংলগ্ন, বিরাট কাছারিঘর, অন্দরমহলের নির্মাণ ও লক্ষীজনার্দন মন্দির তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন। দুর্গাবাড়ি ও দুর্গাবাড়ি সংলগ্ন কাছারি বাড়িটি ২ বিঘা জায়গার উপর নির্মিত। অন্দর মহলের বিলাসবহুল সৌন্দর্যও দেখার মতো।

সেখান থেকেই বসে বাড়ির মেয়েরা, পর্দানশিব থেকে তিন দিন যাত্রা শুনতেন। দেখতেন নর্তকী নৃত্য! জানা গেছে, বর্ধমানের নীলপুর থেকে এসে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন সরকার বংশের আদিপুরুষ ভারতচন্দ্র ঘোষ। পরবর্তী কালে ইংরেজ শাসকদের আমলে ঘোষরা সরকার হয়। বংশের আদিপুরুষের পর্যায়ের কৃষ্ণহরি সরকার ছিলেন নিঃসন্তান। তাই তাঁর ইচ্ছেতেই বর্ধমানের নীলপুর থেকে এসে, সুরুলের গুরুবাড়িতে সস্ত্রীক দেখা করে, কাশী বাসি হবেন, এই বাসনা ছিল। যদিও কথিত আছে গুরুর আর্শীবাদে তাঁর সন্তান সন্ততি হয়। গুরুর নির্দেশে গ্রামের ভৈরব নাথের কাছে প্রার্থনা করে।

তারপর থেকেই তিনি গুরুর গ্রাম সুরুলে বসবাস করতে শুরু করেন। সেই কৃষ্ণহরি সরকারের প্রতিষ্ঠিত দুর্গাপুজো এখনও রয়েছে, এবং যা আজ ইতিহাসের পরিচিতি লাভ করেছে। তিনিই নানা দেব দেবীর পুজো ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। অতীতের সেই আয় না থাকলেও, বর্তমান কয়েকটি পুকুর, বাগান ও জমির প্রায় ৪৫-৫০ বিঘে আয়েই চলে সরকারদের যাবতীয় পুজো।

error: Alert: Content is protected !!