বিজেপিতে যেন থেকেও নেই মুকুল, অসুস্থতা না অন্য কারণ?

মনোরঞ্জন যশ, দুর্গাপুর :

প্রথম তিনিই তৃণমূলের অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগদান করেছিলেন। আর তার যোগদানের পর ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করেছিল ঘাসফুল শিবির। তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী হিসেবে পরিচিত মুকুল রায় প্রায় তিন বছর আগে তৃণমূল ছেড়ে যোগ দেন বিজেপিতে। তারপর বহু ধৈর্য সহকারে গেরুয়া শিবিরে কাজ করেছিলেন তিনি। তবে প্রথম থেকেই বিজেপিতে যোগদানের দিন থেকে তিনি দাবি করে এসেছিলেন, তার প্রধান লক্ষ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করা।

তাই সঠিক জায়গা না পেলেও একের পর এক তৃণমূল থেকে নেতা ভাঙিয়ে আনা থেকে শুরু করে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থীদের সাফল্য পাইয়ে দেওয়ার পেছনে প্রধান কৃতিত্ব ছিল এই মুকুল রায়ের। পরবর্তীতে তাকে বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি করেছিল। লোকসভা নির্বাচনে সংগঠন সাজানো থেকে শুরু করে প্রার্থী নির্বাচন, সবকিছুর ক্ষেত্রে মুকুল রায়কে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হলেও, বিধানসভা নির্বাচনে তাকে অতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলেই শোনা যায়।

তাই সেভাবে বিধানসভা নির্বাচনে গোটা রাজ্যে প্রচার করতে দেখা যায়নি মুকুল রায়কে। শুধুমাত্র কৃষ্ণনগর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী করার কারণে সেখানে পড়ে থেকে নিজের জয়লাভ নিশ্চিত করেছেন বঙ্গ বিজেপির চাণক্য। তবে বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে বিধায়ক হলেও, প্রবীণ এবং অভিজ্ঞতার দিক থেকে তাকে রাজ্য বিধানসভায় বিজেপির বিরোধী দলনেতা করা হয়নি। বরঞ্চ অনুজ শুভেন্দু অধিকারীকে বিরোধী দলনেতা করার জন্য সুযোগ করে দিয়েছেন মুকুল রায়। তবে বিজেপি এরাজ্যে বিরোধী দলের ক্ষমতা দখল করার পরেও, সেভাবে গেরুয়া শিবিরে সক্রিয় ভূমিকায় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না মুকুলবাবুকে। যার ফলে জল্পনা ক্রমশ বাড়তে শুরু করেছে।

একাংশ বলছেন, বর্তমানে কিছুটা হলেও সুস্থ রয়েছেন মুকুল রায়। কিছুদিন আগেই তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এমনকি তার সহধর্মিণীও বর্তমানে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাই এই সমস্ত বিষয় নিয়ে খুব চিন্তিত রয়েছেন তিনি। যার কারণে রাজনীতিতে খুব একটা সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে না বঙ্গ বিজেপির চাণক্যকে। তবে অপর অংশের মতে, তিনি এবারের নির্বাচনকে খুব সিরিয়াসলি নিয়ে ছিলেন। মনে মনে স্থির করে নিয়েছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রমাণ দেবেন।

কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি তাকে ঠিক মত কাজে লাগায়নি। যার কারণে ঠিকমত কাজ করতে পারেননি তিনি। স্বাভাবিক ভাবেই বিজেপি এই রাজ্যে বিরোধীদলের জায়গা দখল করেছে। আর তারপর থেকেই রীতিমত ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন মুকুল রায়। সেভাবে দলের সঙ্গে তাকে যোগাযোগ রাখতে দেখা যাচ্ছে না বলেই দাবি করা হচ্ছে সমালোচক মহলের তরফে। তাই এই পরিস্থিতিতে একটা গুঞ্জন তৈরি হয়েছে, তাহলে কি ধীরে ধীরে নিজেকে বিজেপির সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন মুকুলবাবু?বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একসময় মুকুল রায় মন্তব্য করেছিলেন, 2021-এর পর তিনি তার পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেবেন। অর্থাৎ সেই সময় মুকুল রায়ের মন্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, তিনি হয়ত বা 2021 এর পর থেকে নিজেকে রাজনীতির ময়দান থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে নেবেন। 2021 এ বিজেপি ক্ষমতা দখল করলে তার রাজনৈতিক জীবনের সেটা যে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার হবে, তা মুকুল রায়ের কথা থেকেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। তবে তার সেই আশা পূর্ণ হয়নি। যার কারণে কিছুটা হলেও হতাশ হেভিওয়েট এই বিজেপি নেতা।

ইতিমধ্যেই বিধানসভাতে গিয়ে বিধায়ক পদে শপথ নেওয়ার পর তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীর সঙ্গে মুকুল রায়ের সাক্ষাৎকার গুঞ্জন বাড়িয়ে দিয়েছে। তার পরেই একাংশ দাবি করছেন, হয়ত বা তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলাতে পারেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই প্রাক্তন সৈনিক। সেদিক থেকে তৃতীয়বার তৃণমূল ক্ষমতা দখল করার পরেই যখন বিরোধী দল হিসেবে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছে, তখন কার্যত বিজেপি বিধায়ক হয়েও সেভাবে সক্রিয় থাকতে দেখা যাচ্ছে না মুকুল রায়কে।

স্বাভাবিক ভাবেই তিনি কি অন্য কোনো চিন্তা করছেন, নাকি দলের একাংশের আচরণে কার্যত নিজেকে প্রদীপের আলো থেকে সরিয়ে নিলেন মুকুলবাবু? এখন তা নিয়ে জল্পনা ক্রমশ জোরালো হতে শুরু করেছে। দলের অনেকে বলছেন, এই পরিস্থিতিতে বিজেপিকে যদি ঘুরে দাঁড়াতে হয়, তাহলে মুকুল রায়ের মত অভিজ্ঞ নেতাকে গুরুদায়িত্ব দেওয়া উচিত। কেননা গত লোকসভা নির্বাচনে তাকে গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব দেওয়ার কারণেই বিজেপি অভূতপূর্ব ফলাফল করেছে।

বিধানসভা নির্বাচনে তাকে ঠিক মত ব্যবহার না করার কারণেই বিজেপিকে ভরাডুবির মুখে পড়তে হয়েছে। তাই এই পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য এবং তৃণমূল সরকারকে চাপে রাখতে মুকুল রায়কে আবার দায়িত্ব দিয়ে সক্রিয় করা উচিত ভারতীয় জনতা পার্টি বলেই দাবি করছেন একাংশ সব মিলিয়ে গোটা পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, প্রখর রাজনীতিবিদ মুকুল রায়ের সক্রিয় না থাকা এবং দীর্ঘ নীরবতার কারণ কি, এখন সেই রহস্য সন্ধানেই ব্যস্ত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।