ইয়াস এ তছনছ দিঘা-শংকরপুর, তদন্তের ইঙ্গিত দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

মনোরঞ্জন যশ, দুর্গাপুর :

সাম্প্রতিককালে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় ইয়াশ এর জেরে রীতিমতো লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী অঞ্চল এবং উত্তর ও দক্ষিণ 24 পরগনার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র দীঘা এবং শংকরপুর ঘূর্ণি ঝড়ের তাণ্ডবে রীতিমতো লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছে।

আর এখানেই মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তুলেছেন, খুব বেশিদিন হয়নি দীঘার সৌন্দর্যায়নের কাজ হয়েছে। কিন্তু সেই সৌন্দর্যায়ন টিকে থাকতে পারেনি ঘূর্ণিঝড়ের সামনে। এ ব্যাপারে বুধবার নবান্নে একটি বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী এবং সেখানেই মুখ্যমন্ত্রী ইঙ্গিত দেন পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করার। পাশাপাশি দীঘার চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

আর তারপরেই প্রশ্ন উঠেছে, ঠারেঠোরে কি মুখ্যমন্ত্রী অধিকারী পরিবারের মাথাকেই এই ঘটনার জন্য দায়ী করেছেন? প্রসঙ্গত, শিশির অধিকারী দীর্ঘদিন দীঘা শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই তাঁর নজরদারিতে এই কাজ হয়েছে এবং সেই কাজ যে ঠিকঠাক হয়নি, সে কথা মুখ্যমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করে নিলেন।

পাশাপাশি এবারের ঘূর্ণিঝড়ের দেখা যাচ্ছে, গত ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের পর যে বাঁধগুলি দেওয়া হয়েছিল, নতুন করে সেই বাঁধ আবার ভেঙে পড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তুলেছেন, একের পর এক বাঁধ কি করে ঝড়ের মুখে টিকে থাকতে না পেরে ভেঙে পড়ে? আর এক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগের আঙুল তুলেছেন সেচ দপ্তরের দিকে।

প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন যাবৎ রাজ্যের মন্ত্রী ছিলেন রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারী। যে দুজন এই মুহূর্তে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির অন্যতম নেতা। বিধানসভা নির্বাচনের আগে শুভেন্দু ও রাজীব যখন বিজেপিতে যোগদান করেন, তখন শিশির অধিকারীর সঙ্গে তৃণমূলের দূরত্ব তৈরি হয়। এবং শিশির অধিকারীকে দীঘা শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান থেকে সরিয়ে দিয়ে সে জায়গায় আনা হয় অধিকারী পরিবারের বিরোধী হিসেবে পরিচিত তরুণ জানাকে। তৃতীয় দফায় তৃণমূল সরকার গঠন হওয়ার পর তরুণ জানাকে ভাইস-চেয়ারম্যান করে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার অধিকারী পরিবারের আরেক বিরোধী হিসেবে পরিচিত জ্যোতির্ময় করকে দীঘা উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়।

আপাতত নতুন করে ভেঙে পড়া পর্যটন কেন্দ্রগুলি সাজানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্য উপদেষ্টা আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর। বুধবার আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাশে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একের পর এক বৈঠক করেছেন কিভাবে ইয়ার্স পরবর্তী বিপর্যয় সামলানো যায় এবং কিভাবে আবার দীঘা শঙ্করপুরকে আগের অবস্থায় ফেরানো যায় তা নিয়ে আধিকারিকদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। সবশেষে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই প্রশ্ন তোলেন, সরকারি টাকা ঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছেনা। প্রতিবছর বাঁধ দিলেও তা ভেঙে পড়ছে কেন? আর এই জায়গাতেই মুখ্যমন্ত্রী স্বচ্ছতা আনার কথা তুলেছেন।

বাঁধ ভেঙে পড়া ও বনসৃজন নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি ব্রিজ তৈরির কাজ থমকে যাওয়া নিয়ে সেচ দপ্তরের দিকে আঙ্গুল তোলা হয়েছে। তবে মুখ্যমন্ত্রী সেচ দপ্তরের দিকে আঙ্গুল তুললেও কোন অফিসারকে দোষারোপ করেননি। আর সেখান থেকেই আরো স্পষ্ট হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর ইংগিত। দীঘা উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী বেশকিছু নির্দেশ দিয়েছেন। জানা গিয়েছে, মেরিন ড্রাইভের মত দীঘায় রাস্তা তৈরি করা হবে।

পাশাপাশি হকারদের দোকানগুলি তৈরি করে দেওয়া হবে আবাসন দপ্তর বা দীঘা উন্নয়ন পর্ষদ থেকে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সমুদ্র থেকে নির্দিষ্ট জায়গা বাদ দিয়ে এবার থেকে হোটেল তৈরি করতে হবে। সব মিলিয়ে মুখ্যমন্ত্রী যে পূর্বতন সেচ মন্ত্রীদের কড়া বার্তা দিলেন সে ব্যাপারে নিশ্চিত রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি অধিকারী পরিবারকেও তিনি যে সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখছেন না, সেকথা স্পষ্ট। আপাতত তদন্তে কোন সূত্র বেরিয়ে আসে, এখন সে দিকেই নজর রাখছে ওয়াকিবহাল মহল।