২১ এর মেগা ফাইটে সাফল্য, তৃণমূল কংগ্রেসের এখন নাম্বার টু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়

মনোরঞ্জন যশ, দুর্গাপুর :

বিরোধী থেকে শুরু করে তৃণমূলের অনেকে গোপনে হোক বা প্রকাশ্যে, দলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তড়িৎগতিতে উত্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিলেন। তৃণমূলের একসময়কার নেতা তথা বর্তমান বিজেপি নেতা মুকুল রায় থেকে শুরু করে শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপিতে যোগদানের পিছনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলে প্রকট গতিতে উত্থানকে দায়ী করছেন অনেকে। অনেকে এটাও বলতে শুরু করেছিলেন, তৃণমূল কংগ্রেসে পরিবার তন্ত্র চলছে। সেদিক থেকে বিরোধীদের পক্ষ থেকে বারবার কটাক্ষ করে বলা হয়েছে, “পিসি আর ভাইপোর কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।”

তবে সেই সমস্ত কিছুকে মুখ বুজে সহ্য করে ধীরে ধীরে যে পরিণত রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, শনিবার সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়ার পরেই তা স্পষ্ট হয়ে গেল। বস্তুত, প্রবল বিজেপির হাওয়া থাকা সত্ত্বেও 2021 এর বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাজ্যের ক্ষমতা দখল করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। আর এর পেছনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যারিশমা যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সূক্ষ্ম মস্তিষ্ক। যার জেরে তৃণমূল এই অভূতপূর্ব ফলাফল করতে সক্ষম হয়েছে।

অনেকে বলছেন, ভোটে যদি এবার তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবি হত, তবে সবাই দায়ী করতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কিন্তু তেমনটা হয়নি। বিরোধীদের তরফ থেকে এমনকি তৃণমূল কংগ্রেসের অনেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানের জন্য খারাপ ফল হতে পারে বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত দেখা গেছে, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় বসেছে তৃণমূল কংগ্রেস। আর তারপরেই শনিবার সাংগঠনিক বৈঠকে সেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে কার্যত দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড করে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ বাংলার পর এবার সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে দলের বিস্তৃতি ঘটাতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান তুরুপের তাস, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর দায়িত্ব পাওয়ার পরই দলের একের পর এক বর্ষিয়ান নেতাকে প্রণাম করে আশীর্বাদ নিয়ে নিজের নয়া ইনিংস শুরু করতে চাইলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। স্বভাবতই তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের জায়গা পাওয়া অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে একের পর এক বর্ষীয়ান নেতার বাড়িতে গিয়ে তাদের কাছ থেকে আশীর্বাদ নিলেন, তাতে রীতিমত হতবাক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

সূত্রের খবর, শনিবার দায়িত্ব পাওয়ার পর রবিবার সকালে দলের বর্ষিয়ান নেতা তথা মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে পৌঁছে যান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। যেখানে বেশ কিছুক্ষণ পার্থবাবুর সঙ্গে কথা বলে তার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ নেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো। পরবর্তীতে সেখান থেকে তিনি পৌঁছে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত সৈনিক তথা দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীর বাড়িতে। যেখানে সুব্রতবাবুকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জড়িয়ে নেন তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি।

আবেগান্বিত হয়ে সুব্রত বক্সী বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক কষ্ট করেছেন। তোকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আশীর্বাদ করেছেন। আমার যতটুকু যা আছে, সব কিছু তোকে উজাড় করে দিয়ে দেব।” পরবর্তীতে সেখান থেকে দলের আর এক বর্ষিয়ান নেতা সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে পৌঁছে যান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। দুজনের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা হয়। স্বাভাবিক ভাবেই এই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে রীতিমত হতবাক হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক মহল।

অনেকে বলছেন, যে যত উন্নত, সে তত নত। হয়ত বা দার্শনিকদের সেই কথাকে প্রাধান্য দিয়ে বড় দায়িত্বে বসার পরেই নত হওয়ার কাজ শুরু করে দিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এক্ষেত্রে বাঙালির রেওয়াজ এবং রীতি অনুযায়ী বড় জায়গায় পৌঁছানোর পরই দলের বরিষ্ঠ নেতৃত্বকে প্রণাম করে আশীর্বাদ নিয়ে নয়া ইনিংস শুরু করার চেষ্টা করলেন তিনি।

একাংশ বলছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো হওয়ার সুবাদে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক কঠিন জায়গা খুব সহজেই লাভ করেছেন বলে দাবি করা হত। তবে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের জায়গা পাওয়ার পর গুরুজনদের প্রণাম করে আশীর্বাদ নিয়ে নিজের অহংকার ত্যাগ করার চেষ্টা করলেন অভিষেকবাবু বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পর্যবেক্ষকদের মতে, দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব অনেক। সামনেই 2024 সালের লোকসভা নির্বাচন। তৃণমুল কংগ্রেসের কাছে এই লোকসভা নির্বাচন বড় টার্গেট। তাই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত তরুণ তুর্কিকে কাজে লাগাতে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বিস্তার লাভ করবার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাকে গুরুদায়িত্ব দিয়েছেন। আর দায়িত্ব পেয়ে তিনি যে অহংকারী নয়, বরঞ্চ নত হতে শিখেছেন, তা বোঝানোর চেষ্টা করলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

অর্থাৎ এতদিন বিরোধীদের পক্ষ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে অহংকারী এবং আরও অন্যান্য তকমায় ভূষিত করে যে অভিযোগ করা হয়েছিল, নতুন দায়িত্বে আসার পরে সেই অভিযোগ কার্যত খন্ডন করে দিলেন তিনি। দলের একের পর এক বর্ষীয়ান নেতার কাছ থেকে আশীর্বাদ নিয়ে নিজেকে ভাঙ্গা-গড়া এবং পরিশীলিত রাজনীতিবিদ হিসেবে গঠন করার চেষ্টা করলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।