একুশের গানের খ্যাতনামা কবি গাফফার চৌধুরী প্রয়াত!

রাধামাধব মণ্ডল :

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি 
আমি কি ভুলিতে পারি’

’‌–কালজয়ী একুশে গানের রচয়িতা, প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং সাহিত্যিক আব্দুল গফ্‌ফর চৌধুরি আর নেই। বৃহস্পতিবার লণ্ডনের বার্নেট হাসপাতালে, স্থানীয় সময় সকাল ৬ টা ৪০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘ দিন তিনি দুরারোগ্য কিডনিজনিত রোগে ভুগছিলেন, একুশের পদক জয়ী এই সাহিত্যিক। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মহম্মদ আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁরা বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন ও তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান তাঁরা। মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁর প্রকাশিত পত্রিকা ‘জয় বাংলা’ মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। আব্দুল গফ্‌ফর চৌধুরি বরিশাল জেলার গ্রাম উলানিয়ার চৌধুরি বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।  সাংবাদিকতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, স্মৃতিকথা, ছোটদের উপন্যাসও লিখেছেন তিনি। ‘চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’, ‘সম্রাটের ছবি’, ‘ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা’, ‘বাঙালি না বাংলাদেশি’সহ তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা প্রায় ৩০। এছাড়াও তিনি কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ নাটক লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘একজন তাহমিনা’ ‘রক্তাক্ত আগস্ট’ ও ‘পলাশী থেকে বাংলাদেশ’।

কালজয়ী এই গানটির স্রষ্টা কবি আবদুল গাফফার চৌধুরী। একাধারে তিনি সাংবাদিকতা করতেন, ছিলেন সাহিত্যিক, কলামিস্ট। খ্যাতি পেয়েছিলেন বুদ্ধিজীবী হিসেবেও। একুশের সেই গান রচনা গাফফার চৌধুরীর জীবনে বড় একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এই একটি গানই তাকে খ্যাতি এনে দিয়েছিল।
১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে এই গানটি ছিল তখনকার ছাত্র-যুবক-জনতার মুখে মুখে রটে যাওয়া একটি মন্ত্র। শক্তি এনেছিল এই গান। অস্ত্রের মতো কাজ করেছে গানটি। পাকিস্তানিদের বুলেটের মুখে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে এই গান সংগ্রামরত নিরস্ত্র বাঙালিদেরকে উজ্জীবিত করেছিল। কোনো গান যে বিপ্লবের শক্তি হতে পারে, তা এই একটি গানই বুঝিয়ে দিয়েছিল সেদিন। আজও সমান জনপ্রিয় এই গান। সমস্ত বাঙালিকে এক করেছে এই গান।
শুধু ভাষা সংগ্রাম নয়, পরে মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির মুক্তির সংগ্রামেও এই গান প্রভাব রেখেছে পদ্মা ও গঙ্গা পাড়ের মাটিতে। 

“..আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো..” হিসেবে সুপরিচিত একুশের এই গানের কথায় ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখে সংঘটিত বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ফুটে উঠেছে যেন। 
সাংবাদিক, লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে এই গানটি রচনা করেন। যা তাঁকে অমরত্ব দিয়ে গেল।

জানা যায়, প্রথমে আবদুল লতিফ গানটিতে সুরারোপ করেন। তারপর গানটিতে সুর দেন আলতাফ মাহমুদ। আর তাঁর করা সুরটিই অধিক জনপ্রিয়তা পায় দুই দেশ ছাড়িয়ে। ১৯৫৪ সালের প্রভাত ফেরিতে প্রথম গাওয়া হয় আলতাফ মাহমুদের সুরে “…আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…” গানটি এবং এটিই এখন গানটির প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিত সুর। 
১৯৬৯ সালে জহির রায়হান তাঁর ‘জীবন থেকে নেওয়া’ চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহার করেন।  কালজয়ী এই গানটি হিন্দি, মালোয়ালাম, ইংরেজি, ফরাসি, সুইডিশ, জাপানিসহ ১২টি ভাষায় গাওয়া হয়েছে এই গানটিকে।

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়া-এ ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।।
জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালবোশেখীরা
শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,
দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবী
দিনবদলের ক্রান্তিলগ্নে তবু তোরা পার পাবি?
না, না, না, না খুন রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।
সেদিনও এমনি নীল গগনের বসনে শীতের শেষে
রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে;
পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকনন্দা যেন,
এমন সময় ঝড় এলো এক ঝড় এলো খ্যাপা বুনো।।
সেই আঁধারের পশুদের মুখ চেনা,
তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভায়ের চরম ঘৃণা
ওরা গুলি ছোড়ে এ দেশের প্রাণে দেশের দাবীকে রোখে
ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই সারা বাংলার বুকে
ওরা এদেশের নয়,
দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়
ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।
তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারি
আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী
আমার শহীদ ভায়ের আত্মা ডাকে
জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাটে
দারুণ ক্রোধের আগুনে আবার জ্বালবো ফেব্রুয়ারি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।”

গানটি একটি খবরের কাগজের শেষের পাতায় একুশের গান শিরোনামে প্রথম প্রকাশিত হয়েছে। তখন গীতিকারের নাম ছাপা হয়নি। পরে অবশ্য গীতিকারের নাম ছাপা হয়। ১৯৫৪ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত একুশে সংকলনেও প্রকাশিত হয় গানটি। জানা গেছে তৎকালীন সরকার সংকলনটি বাজেয়াপ্ত করেছিল।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ ভাষা আন্দোলনকারী ছাত্রদের মিছিলে গুলি চালায়। এতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার প্রমুখ ছাত্র নিহত হয়। সেই সময় ঢাকা কলেজের ছাত্র আবদুল গাফফার চৌধুরী ঢাকা মেডিকেলে যান আহত ছাত্রদের দেখতে। ঢাকা মেডিকেলের আউটডোরে তিনি মাথার খুলি উড়ে যাওয়া একটি লাশ দেখতে পান, যেটি ছিল ভাষা সংগ্রামী রফিকের লাশ। 

রফিকের লাশটি দেখে তাঁর মনে হয়, এটা যেন তাঁর নিজের ভাইয়েরই রক্তমাখা একটি লাশ। তৎক্ষণাৎ তাঁর মনে গানের প্রথম দুটি লাইন জেগে ওঠে। পরে কয়েক দিনের মধ্যে ধীরে ধীরে তিনি গানটি লিখেন। ভাষা আন্দোলনের প্রথম প্রকাশিত লিফলেটে এটি ‘একুশের গান’ শিরোনামেই প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে সংকলনে’ও এটি প্রকাশিত হয়েছিল।
ঢাকা কলেজের কিছু ছাত্র কলেজ প্রাঙ্গণে শহীদ মিনার স্থাপনের চেষ্টা করার সময়ও গানটি গেয়েছিলেন তাঁরা। গানটি গাওয়া আর লেখার দায়ে ঢাকা কলেজ থেকে ১১ জন ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এগান তখনই ইতিহাস হয়।

প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সব অঞ্চল থেকে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শত শত মানুষ এই গান গেয়ে শহীদ মিনার অভিমুখে খালি পায়ে হেঁটে যান। ভারতবর্ষেও এই গানটি গাওয়া হয়, একুশে ফেব্রুয়ারির দিন।
ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরিতে এই গান গেয়ে সবাই শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যায়।
গানটির রচয়িতা আব্দুল গাফফার চৌধুরী আজ আর নেই। তবে তাঁর সৃষ্টি কালজয়ী এ গান মানুষের মুখে মুখে থেকে যাবে বহুকাল।

Click here for follow us on facebook — Ektara Bangla